প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ নির্বাচন নির্বাচন কমিশন মুক্ত ও স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান এবং তিনি আশাবাদী তারা একটি স্বচ্ছ সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সঙ্গে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি সমাজ শিক্ষা সংস্কৃতি সহ জাতীয় আন্তর্জাতিক নানা বিষয় তুলে ধরেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও নানা কথা বলেন। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ভয়েস অব আমেরিকা প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সাক্ষাৎকারে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, উন্নয়ন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এসব বিষয় উঠে আসে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি আজ সাড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যত রকমের সুযোগ দেওয়ার, আমরা তাদের সেক্টরকে দিয়ে দিচ্ছি। তবে কাজ করতে গেলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো যে কথাগুলো আসে, হ্যাঁ সে সমস্যা হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যা কি আমার অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারছে? তা তো পারছে না।’
এসময় তিনি আরো বলেন, কেউ যদি একথা বলে, তবে সেটা তাদের ব্যাপার। তবে বিষয়টা নিয়ে আমি কিছু কথা বলেছি প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে, তিনি বলেছেন না, তাদেরকে ফেরত পাঠানো বা এমন কোনো চিন্তা তাদের নেই।
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও সেনা শাসনের কঠোর সমালোচনা করে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। সেজন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম যেটাই করেছি, আমার ¯েøাগানই ছিল ‘ আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’। এই ¯েøাগানটা দিয়ে মানুষের ভেতরে তার ভোটের অধিকার সম্পর্কে তাকে সচেতন করা। আমি সেটা সফলভাবে করতে পেরেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ৭৩ সালে জনগণ ভোট দিল। যে কোনো দেশে বিপ্লবের পর এত দ্রæত গণতন্ত্র দেয়ার ইতিহাস কোথাও নেই। একমাত্র সেটা করেছে, জাতির পিতা শেখ মুজিব সে দৃষ্টান্তটা স্থাপন করেছিলেন। আর এই ধারাবাহিকতাটা যদি চলতে পারতো তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই উন্নত দেশ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতো। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সেটা সেভাবে হয়নি। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, ক্ষমতার জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই না, গোটা পরিবারকে হত্যা করা হলো। এরপর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো। এই হত্যার উদ্দেশ্যটাই হলো স্বাধীনতার চেতনাটাকে ধ্বংস করা। আর এই যে, এতদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের যে মৌলিক অধিকারগুলোই যে অর্জন হয়েছিল, ভোটের অধিকার অর্জন হয়েছিল, দেশের মানুষ তার বেঁচে থাকার সুন্দর সুযোগ পাচ্ছিল সেই জিনিসটাকে ধ্বংস করে দেয়া হলো।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, যে মিলিটারি ডিক্টেটররা ক্ষমতা দখল করেছিল তারা কিন্তু জনগণের ভোটকে সুসংহত করা বা সুরক্ষিত করা বা ভোটের মাধ্যমে জনগণ যে তাদের পছন্দমতো সরকার গঠন করবে সে সুযোগটা তারা দেয়নি।
তিনি বলেন, কোনো মিলিটারি ডিক্টেটররা যখন ক্ষমতায় আসে তখন রাজনীতিবিদদের বকাঝকা দিয়েই আসে। এরপর নিজেই রাজনীতিবিদ হয়ে যায়। উর্দি খুলে কাপড় চেঞ্জ করে রাজনীতিবিদ হয়। দল গঠন করে। আর সেই দল দিয়ে তারা চেষ্টা করে ভোট রিগিং করে টু থার্ড মেজরিটি পার্লামেন্টে। উদ্দেশ্য একটাই- সেটা হলো তাদের যে অবৈধ ক্ষমতা দখল এবং মার্শাল ল’ অর্ডিনেন্স দিয়ে যে আইন-টাইন করে, যে নির্দেশ দেয় সেগুলোকে লেজিটিমাইজ করা। সেটা করতে গেলে টু থার্ড মেজরিটি লাগবে। সংবিধান আবার যদি রিভাইভ করতে … টু থার্ড মেজরিটি লাগবে। সংবিধান সংশোধন তারা করে… এই প্রক্রিয়াটা করার মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশের জনগণের ভোটের অধিকারটা হরণ করা হয়। যেহেতু অবৈধ ক্ষমতা দখল সেটিকে বৈধতা দেয়ার জন্য নির্বাচনের নামে প্রহসন, আর ওই প্রহসনের মাধ্যমে টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে, ভোটের খেলা খেলে একটা অবৈধ ক্ষমতা বৈধ করা।
‘ওই জায়গা থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনা ও বাংলাদেশে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা এটাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। সেজন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম যেটাই করেছি, আমার স্লোগানই ছিল ‘ আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’। এই স্লোগানটা দিয়ে মানুষের ভেতরে তার ভোটের অধিকার সম্পর্কে তাকে সচেতন করা। আমি সেটা সফলভাবে করতে পেরেছি।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এখন যে ভোট হয়, সেখানে কিন্তু মানুষের মাঝে সাংঘাতিক একটা উৎসাহ থাকে। লাইন ধরে তারা ভোটকেন্দ্রে যায়। যে প্রার্থীদের তাদের পছন্দ হয় তাকে তারা ভোট দেয়। এই অধিকারটা তারা পেয়েছে। আমার সরকার আমলে গত ৪ বছর ৯ মাসে প্রায় ৬ হাজার ইলেকশন (স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা নির্বাচন ও উপনির্বাচন) হলো। এতে দেখলাম মানুষের মাঝে সাংঘাতিক উৎসাহ। মানুষ ভোট দিতে চায়, ভোট দেয় এবং সে খুব গর্ববোধ করে যে সে একটা ভোট দিতে পেরেছে এবং তার মনমতো বা পছন্দমতো লোকটিকে তারা ভোট দিতে পেরেছে।
এখন মানুষের মাঝে সাংঘাতিক উৎসাহ আছে-আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তারা (জনগণ) তাদের পছন্দমতো সরকার গঠন করবে।
এক পর্যায়ে ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেন- ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর সরকার থেকে আপনার সময় পর্যন্ত এখনও ভোটের রাজনীতির কথা বারবার শুনেছি। আপনি নিজে একাধিকবার ক্ষমতায় থেকেছেন, বিরোধী দলেও থেকেছেন। আপনি আজ যদি বিরোধী দলে থাকতেন তাহলে আজকের নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে দেখতেন? নির্বাচন কমিশনকে কেমন ধারার মনে হতো? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মনে হতো কী?’
এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এর আগে বিগত সরকার নির্বাচন কমিশন নিজেদের ইচ্ছামত করতো। যাকে পছন্দ করতো তাকে বসাতো। এখন কিন্তু নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত হয় একটা সার্চ কমিটির মাধ্যমে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি করে দেন। সেখানে সব দল থেকে নাম পাঠানো হয়, সেই নাম থেকেই সার্চ কমিটি পছন্দ করে নির্বাচন কমিশন গঠন করে। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আমরা এই স্বচ্ছতাটা আনতে পেরেছি।
এখন যে কতগুলো ইলেকশন হলো, সেগুলো যদি যাচাই-বাছাই করেন, দেখেন তাহলে দেখেন তাহলে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, ইলেকশন করার মতো সুন্দর একটা পরিবেশ এখন আছে। লেভেল প্লেয়িং বলতে আপনি কী বুঝেন আমি জানি না। কিন্তু আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি মনে করি, জনগণ স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ভোট দিতে যাচ্ছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ত স নি উদাহরণ তুলে ধরেন।
সাক্ষাতকারে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ সবসময় পাশে ছিল বলেই রোহিঙ্গা সংকটের মত এত বড় একটি সমস্যা মোকাবেলা করা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সাড়া পেয়েছি। বিশেষ করে কক্সবাজারের মানুষগুলো। তাদের সব থেকে বেশি কষ্ট। কারণ তাদের চাষের জমি বলেন, বনভ‚মি এসব তাদের দিয়ে দিতে হল। মিয়ানমারের সঙ্গে ইতিমধ্যে দুটো চুক্তি করে ফেলেছি। এবং তারা স্বীকার করেছে তাদের নিয়ে যাবে। প্রথমে আমরা কিছু পাঠাবো, তারা কি আচরণ করে সেটা দেখবো, তারপর আরো পাঠাবো।
ভারতের আসামে নাগরিকত্ব তালিকা প্রণয়ন এবং সেখানে অবৈধ বাংলাদেশি থাকার বিষয়ে দেশটির সরকারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘ভারতে অবৈধ বাংলাদেশি থাকার বিষয়টি সত্য নয়। বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার এক ধরনের রাজনীতি করছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটা বোধহয় ভারতের পলিটিক্স। এটা তাদের নিজস্ব পলিটিক্স, তারা বলছে কিন্তু আমি মনে করি না আমার কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত। তবে সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?




