একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি, গতকালের ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট কোনটা ?? মাহমুদুল্লাহ- ইমরুলের অসাধারণ ব্যাটিং ?? নাজমুল অপুর ইকোনোমিকাল বোলিং ?? মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের উইকেট পাওয়া ?? মোস্তাফিজের লাস্ট ওভার ??সাকিবের উইকেট ?? মাশরাফির শেষ এগারো ওভারের বোলিং ? ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

২৫০ রানের লক্ষমাত্রাটা আস্তে আস্তে মামুলী বানিয়ে ফেলছিলেন অধিনায়ক আসগর এবং শাহিদি । স্পিনে একটু রুম পেলে ব্যাক ফুটে ওস্তাদ এই আফগান ব্যাটসম্যানদের সামনে তখন প্রয়োজন ছিল ডিসেন্ট পেইসে গুড লেন্থ থেকে “রুম” না দেয়া বা একটু কম “রুমে” বোলিং । ছবিতে শুধুমাত্র ৪০ তম এবং ৪৪ তম ওভারের বোলিং এর চিত্র দেয়া হল । কন্ট্রোলের জায়গাটা দেখুন , সবগুলো গুড লেন্থ । ডানহাতি – বা হাতি উভয় ব্যাটসম্যানের জন্য বল ঢুকছে – অর্থাৎ ইনসুইং করছে । প্রথম ছবির সাদা এবং পরের ছবির হলুদ বল উইকেট টেকিং , ফিরিয়েছেন ঐ দু জনকেই । ফ্লাইটেড স্পিনে ওস্তাদ মোহাম্মদ নবীর সামনে পেস বোলারদের (২জন) এক্সপোসড হতে হত । প্রথম কারণ, সাকিব আল হাসানের আংগুলের ব্যাথার কারণে জোরের উপর আর্ম বল গুলো করতে না পারা । সেই সময়টাতে মোহাম্মদ নবীকে ওই লেন্থ এই চমৎকারভাবে বেঁধে রেখেছিলেন মাশরাফি ।

রেডিও ভূমির ধারাভাষ্যকক্ষে আমরা উনাকে নাম দিয়েছি, “ক্যাপ্টেন, বড়ভাই”। “ক্যাপ্টেন বড়ভাই মাশরাফি দৌড়ে আসছেন ওভার দ্যা উইকেট “ – বয়সের বিবেচনায় আমি তাকে বড়ভাই বলতেই পারি , কিন্তু বয়সে তার থেকে বছর দশেকের বড় ধারাভাষ্যকার কামরুজ্জামান যখন তাকে বড়ভাই বলে ডাকেন তখন প্রমাণ হয় “বড়ভাই” শব্দটাকে বয়সের ফ্রেমে বাধা যায় না । অন্তত আমাদের মত আবেগী দেশে তো না – ই । আবেগ ; হ্যা , এই আবেগই মাশরাফি বিন মোর্তজা কে “বড়ভাই” বানিয়েছে ,”গুরু” বানিয়েছে আবার এই আবেগ ই তাকে তকমা দিয়েছে “ ক্যাপ্টেন কোটার খেলোয়াড় ” । শুধুমাত্র সাধারণ ক্রিকেট প্রেমীরা এই তকমা দিলে এক ধরনের কথা ছিল , পর্দার অন্তরালে কিংবা অফ এয়ারে ঘরোয়া আড্ডায় হালের ক্রীড়া সাংবাদিক কিংবা ক্রিকেট বিশেষ+অজ্ঞরা যখন মাঝে মধ্যে এ কথা বলে বসেন তখন তো একটু নড়ে চড়ে বসতেই হয় ।

ক্রিকেট এমন একটা খেলা যেখানে অনেক সময় পরিসংখ্যান সব কথা বলে না । একজন বোলার রান চেক দিয়ে এক প্রান্তে চাপ দিতে থাকেন , যার ফলে অন্য প্রান্তের বোলার দেদারসে উইকেট পেতে থাকেন – এটা ক্রিকেটের টেকনিক্যাল কথা যা রেকর্ড বুকে লেখা থাকে না । কিংবা কোন বোলার প্রতিকূল পরিস্থিুতিতে এসে “গেট ওপেন” করে দিচ্ছেন , যে গেট দিয়ে বাকি বোলাররা ঢুঁকে ধবংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন । আমরা এতটাই বেশি পরিসংখ্যান নির্ভর যে গেট ওপেন করা ব্যাক্তি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যান অনায়াসে । পরিসংখ্যানের হিসেব ও যদি ধরি , তবে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ওডিআই উইকেটধারীর নাম মাশরাফি । আচ্ছা , এই পরিসংখ্যান বাদ দিলাম ,
সাম্প্রতিক স্মৃতিগুলোও একটু ঝালিয়ে নিন, শ্রীলংকার মাটিতে গিয়ে জেতা ওয়ানডে তে ইনিশিয়াল ব্রেক থ্রু কে এনে দিয়েছিলেন ? উপুল থারাংগার ট্র্যাক রেকর্ড খুজলে তো ঘাতক হিসেবে বহুবারই মাশরাফিকেই পাওয়া যায় । এই সেদিনই এশিয়া কাপে উড়ন্ত সূচনা করা থারাংগাকে “আহত বাঘের” মত মরণকামড় দিয়ে ফেরালেন প্যাভিলিয়নে । বোনাস হিসেবে ধানাঞ্জায়াও মাশরাফির শিকার ।

তবে , ব্যাক্তি মাশরাফি কিংবা অভিভাবক মাশরাফি কখনই আড়ালে থাকে না । আড়ালে থাকেন পার্ফরমার মাশরাফি । চায়ের দোকানী থেকে শুরু করে হালে ক্রিকেট বিটের তারকা সাংবাদিকেরাও চায়ের আড্ডায় মাশরাফির অধিনায়কত্ব কিংবা দলকে উজ্জ্বীবিত করার ক্ষমতা নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন , পারফর্মার মাশরাফির পার্ফরম্যান্স আলোচনায় আসে না । বরং , ২-১ ম্যাচ দল খারাপ খেললে তখন বলেই বসেন , মাশরাফিকে দলে দরকার তার ক্যাপ্টেনসির জন্য , ইনজুরিতে বোলিং টা আর হয় না ।

শ্রীলংকার সাথে প্রথম ম্যাচের সময় প্রথম ওভারের পর রমিজ রাজা ধারাভাষ্যে বলছিলেন – মাশরাফির ১২০ গতির বল আর চলে না । প্রকৃতির কি নির্মম পরিহাস, এই ১২০ গতির বল দিয়েই রমিজের স্বদেশী “কিংবদন্তী’ শোয়েব আখতারের পাশে বসলেন আমাদের বড়ভাই ।

১২০ কিমি গতি দিয়ে যদি একটা দেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হওয়া যায় , প্রায় প্রতি ম্যাচে ইনিশিয়াল ব্রেক থ্রু দেয়া যায় , কিংবা পরে বোলিং করার সময় ২য় বা ৩য় স্পেলে এসে ম্যাচে মোড় ঘুরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে গুল্লি মারি সেই গতিকে । অধিনায়ক মাশরাফির বিকল্প যেমন কেউ এখনো নেই , ঠিক তেমনি পার্ফমার মাশরাফির বিকল্প ও এখনো কেউ আসেননি ।

-লেখাটি ক্রিকেটখোর গ্রুপ থেকে নেয়া, লিখেছেন- সৈয়দ আবিদ হোসাইন সামি