চট্রগ্রামের ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন হত্যাকাণ্ডের পর অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে তাসফিয়ার বন্ধু আদনানকে গ্রেফতার করার পর পুলিশের সামনে চলে এসেছে ফেসবুককেন্দ্রিক ‘রিচ কিডস গ্রুপ’। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বুধবার গভীর রাতে নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ আবাসিক এলাকার বাসা থেকে পুলিশ আদনানকে গ্রেফতার করে। এসময় আদনানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়। তার মোবাইলের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
জানা গেছে, আদনান ফেসবুকে ‘রিচ কিডস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপের এডমিন। বিভিন্ন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা এই গ্রুপের সদস্য। পুলিশের ধারণা, তাসফিয়া এবং আদনানের প্রেমের বিষয়টি তাসফিয়ার পরিবার মানতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে আদনান। পরে সে তাসফিয়াকে রিচ কিডস গ্রুপের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়
এদিকে, তাসফিয়ার মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তবে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে, তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাসহ ৬ জনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এর আগে পতেঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম ইত্তেফাককে জানান, মামলার প্রধান আসামি আদনানকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। বাকি আসামিরাও আদনানের বন্ধু। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তদন্তের স্বার্থে তিনি বাকি আসামিদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাসফিয়ার ময়না তদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এবং আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে, তাসফিয়ার মৃত্যুর রহস্য ঘিরে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে কাউকে কিছু না বলে নগরীর ওআর নিজাম রোডের ৩ নম্বর সড়কের বাসা থেকে বের হয় তাসফিয়া। এরপর সন্ধ্যার দিকে আদনানসহ নগরীর গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে দেখা যায়। নগরীর এমএম আলী রোডের বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনানের সাথে এক মাস আগে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাসফিয়া। তবে তাদের এ সম্পর্ক তাসফিয়ার বাবা-মা মেনে নিতে পারেননি। তাই কিছুদিন আগে তারা আদনানকে বাসায় ডেকে অপমানও করেন। কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় সেদিন আদনান তাসফিয়াদের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এভাবে বাসায় ডেকে অপমান করায় ক্ষুব্ধ হন আদনান। সেদিনের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই আদনান তার বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতায় তাসফিয়াকে হত্যা করেছে কিনা পুলিশ তা খতিয়ে দেখছ
তাসফিয়া নগরীর গোলপাহাড় থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে কিভাবে পতেঙ্গা পৌঁছাল, পুলিশ সেটাও বিবেচনায় রেখেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে তাসফিয়ার মা আদনানের কাছে ফোন করে মেয়ের অবস্থান জানতে চাইলে তাকে জানানো হয় অটোরিকশাতে করে তাসফিয়া বাসায় ফিরে গেছে। এরপর আদনান নিজেও তাসফিয়াদের বাসায় যায়। সেখানে গিয়ে সেও তাসফিয়াকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। এই অবস্থায় তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডে আদনান সরাসরি জড়িত ছিল কিনা পুলিশকে তা ভাবনায় ফেলেছে। আবার তাসফিয়ার গাল ও চোখের ওপর হাল্কা আঘাতের চিহ্ন থাকায় তাকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হলেও মুখে ফেনা থাকায় বিষপানে আত্মহত্যার বিষয়টিও পুলিশ ভেবে দেখছে।
পতেঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম ইত্তেফাককে বলেন, আমরা হত্যা বা আত্মহত্যার সম্ভাবনা কোনোটাই এই মুহূর্তে নাকচ করে দিচ্ছি না। আবার এর পেছনে প্রেমঘটিত কোনো কারণও থাকতে পারে। সব বিষয় মাথায় রেখেই আমরা তদন্ত করে যাচ্ছি। আটক আদনান প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য আমাদেরকে দিয়েছে। সেগুলো তদন্তের স্বার্থে বলা যাবে না। তবে আশা করি দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে।
তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি রহস্যজনক উল্লেখ করে সিএমপি’র সহকারী মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, বাসায় কাউকে না জানিয়ে তাসফিয়া বাসা থেকে বেরিয়ে চায়না গ্রিল নামে একটা রেস্টুরেন্টে বন্ধু আদনানের সাথে দেখা করে। পরে মায়ের ফোন পেয়ে দ্রুত বাসায় ফেরার জন্য তাসফিয়াকে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দেন আদনান। রাত নয়টার পরও বাসায় না ফেরায়, তার বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। পরে আবারো আদনানকে ফোন করে তাসফিয়ার খবর জানতে চান। তাসফিয়াকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা জানায় আদনান। মো. জাহেদুল ইসলাম আরো বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছি। স্থানীয়রা, তাসফিয়াকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় একা বসে থাকতে দেখেছেন। পরদিন সকালে ওই মেয়েটির মরদেহ পাওয়া গেছে
তাসফিয়া হত্যার বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন
তাসফিয়া হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সাফিয়া গাজী রহমান তাসফিয়ার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে বলেন, এরকম করুণ মৃত্যু যেন আর কারো না হয়।





