সৌদি আরবের রিয়াদে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভার বিরাব এলাকার আব্দুল মজিদের বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে বিরাব এলাকার আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সন্তানকে হারিয়ে বৃদ্ধা মা জৈবুন্নেছা ও বাবা আওলাদ হোসেন বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। স্ত্রী ময়না বেগম স্বামীর শোকে নির্বাক হয়ে আছেন। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে।
ছয় বছরের একমাত্র মেয়ে আমেনা বাবা বাবা করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে নিজের সংসার আর স্বামীর কর্য কিভাবে পরিশোধ করবেন সে চিন্তায় তারা স্তব্ধ। মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে আব্দুল মজিদের লাশের অপেক্ষায় তার বাড়িতে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছে। পরিবারের সদস্যরা এখন প্রহর গুনছেন কখন মজিদের লাশ আসবে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কাঞ্চন পৌরসভার বিরাব লালটেক গ্রামের আওলাদ হোসেনের মেজো ছেলে আব্দুল মজিদ খান সাত বছর আগে পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়া এলাকার গোলজার ভূঁইয়ার মেয়ে ময়না বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে আমেনা আক্তার নামে ৬ বছরের একটি মেয়ে আছে। সে স্থানীয় বিরাব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। নিজের ভিটে মাটি ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের। একটি ছোট টিনের ঘরে পরিবার নিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে বসবাস করতেন আব্দুল মজিদ। পরিবার ও নিজেকে সচ্ছল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সৌদি আরব যাওয়ার উদ্যোগ নেন। পরে আত্নীয়স্বজন, এনজিও ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুদের উপর ৪ লাখ টাকা নিয়ে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী পলাশ থানাধীন ডাঙ্গা কেন্দুয়াবো এলাকার নাজিমুদ্দিনের মাধ্যমে পাড়ি জমান সৌদি আরবের রিয়াদে। সেখানে প্রায় ৩ তিন মাস কোন কাজ পাননি আব্দুল মজিদ। রিয়াদের আল নুরা ইউনিভার্সিটি আবাসিক এলাকায় একটি ভবনের একটি রুমে ৭/৮ জনের সঙ্গে থাকতেন তিনি। কিন্তু দেশ থেকে টাকা পাঠালে পেটে খাবার জুটতোনা তার।
এক পর্যায়ে ১২ দিন আগে সেখানকার ইউনিভার্সিটিতে ক্লিনারের কাজ পায় সে। প্রতিদিনের মত রাতের কাজ শেষ করে শুক্রবার সকালে অন্যদের সঙ্গে রুমে ঘুমিয়ে পড়েন আব্দুল মজিদ। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণ করেন আব্দুল মজিদ খানসহ রুমের সবাই। দুপুরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একই ভবনে থাকা রাশেদ খান নামে এক যুবক আব্দুল মজিদের বড় ভাই বাছেদ আলীকে আব্দুল মজিদের মৃত্যুর খবর জানায়। এরপর থেকে নিহতের পরিবারে কান্নার রোল পড়ে।
নিহত আব্দুল মজিদের লাশ রিয়াদের সিমুচি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। লাশ দেশে আনার ব্যাপারে পরিবারের সদস্যরা দালালের মাধ্যমে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। নিহত আব্দুল মজিদের স্ত্রী ময়না বেগম বলেন, আমার স্বামীর স্বপ্ন ছিল বিদেশ গিয়া টাকা উপার্জন করে একমাত্র আদরের মেয়ে আমেনাকে অনেক শিক্ষিত করবো। বাড়িঘর একটু ভাল করবো। সংসারে সব কষ্ট দূর হইবো। এখন সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। একদিকে স্বামীর শোক অন্যদিকে স্বামীর ধার করা টাকা কিভাবে শোধ করবে সেই চিন্তায় হতাশার ছায়া এখন তার চোখে। এদিকে পিতা আওলাদ হোসেন ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে শুধু চেয়ে থাকে। নিজের ছেলের লাশ কাঁধে নিবেন সেই কথা মনে পড়লে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সৌদি আরবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত আব্দুল মজিদের পরিবারের খোঁজ খবর নিচ্ছি। লাশ দেশে আনাসহ যেকোনো ব্যাপারে তার পরিবারের লোকজন কোন প্রকার সহায়তার প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই আমরা সহায়তা করবো’।




