গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। হাতটি বেরিয়েছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎই পেছন থেকে স্বজন নামের একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে ঘেঁষে ওভারটেক করায় দুই বাসের চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ঘটনার পর পথচারীরা দ্রুত রাজীবকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জুড়ে দিতে পারেননি। শমরিতা হাসপাতাল সূত্র বলেছে, বিচ্ছিন্ন হওয়া হাতটি জোড়া লাগানো সম্ভব নয়, তার অবস্থা গুরুতর। গতকালই তার অস্ত্রোপচার করা হয়।
এর প্রেক্ষিতে ৪ এপ্রিল হাইকোর্ট রাজীব হোসেনের চিকিৎসা ব্যয় ওই দুই বাস মালিককে বহন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ নির্দেশ দেন। রুলে ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হাত হারানো রাজীব হোসেনকে কেন এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
বর্তমানে রাজীব ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
গত ৫ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে আয়েশা ছয় বছর বয়সী মেয়ে আহনাবিকে বহনকারী রিকশাটিকে একই দিক থেকে দ্রুত গতিতে আসা বিকাশ পরিবহনের দুটি বাস মাঝে ফেলে চাপ দেয়। বাস দুটি রিকশাটিকে ঠেলে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়। এতে গুরুতর আহত হন আয়েশা খাতুন। ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করেন। দুর্ঘটনায় তার ৬ বছর বয়সী মেয়ে আহনাদও আহত হয়। আয়েশার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে। শরীরে বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে। মেয়ে আহনাদও আঘাত পেয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মেরুদণ্ডের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। কোমর থেকে নিচের অংশ অকেজো হয়ে গেছে। এখন তিনি বসতে পারবেন, কিন্তু দাঁড়াতে কিংবা চলতে পারবেন না।
আনন্দ সিনেমা হলের সামনে বাস থেমে যাত্রী ওঠা-নামা করে। সেখান সড়কে উঁচু বিভাজক আছে। ওই বিভাজকের ওপর যাত্রীরা দাঁড়ান। গত ১১ এপ্রিল সকাল নয়টার দিকে রুনি আক্তার সড়ক থেকে উঁচু বিভাজকের ওপর উঠতে যাচ্ছিলেন। এ সময় বেপরোয়া গতির নিউ ভিশন পরিবহনের একটি বাস সড়ক বিভাজক ঘেঁষে এগিয়ে আসে। বিভাজক ও বাসের মাঝে ওই নারীর ডান পা চাপা খায়। এতে তার ডান পায়ের হাঁটু সংলগ্ন অংশ থেঁতলে যায়। আহত রুনি আক্তারকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে রাজধানীসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন। পঙ্গু হয়েছে ১ হাজার ৭২২ জন। এ ছাড়া আহতের সংখ্যা ১৬ হাজার ১৯৩। মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ৪ হাজার ৯৭৯।
সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, দুর্ঘটনায় ২০১৬ সালের তুলনায় সড়কে মৃত্যু বেড়েছে ১ হাজার ৩৪২। গত বছরে এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৫। আহত হন ১৫ হাজার ৯১৪ ব্যক্তি। দুর্ঘটনা ঘটে ৪ হাজার ৩১২টি।
হেলপার দিয়ে বাস চালানোর প্রসঙ্গে এই চালক জানান, এটা সব সময় করা হয় না, মাঝেমধ্যে। বলেন, বেশিরভাগ বাস কোম্পানির নির্দেশ রয়েছে হেলপার দিয়ে বাস না চালানোর। কিন্তু অনেকেই এ নির্দেশনা মানছেন না। বাসমালিকরা তো রাস্তায় থাকেন না, তাই এ সুযোগ কাজে লাগান চালকরা উল্লেখ করেন তিনি।
একাধিক পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলেন, গাড়ি সাধারণত চালককে বুঝিয়ে দেন তারা। দায়িত্ব এখানেই শেষ। রাতে ট্রিপ শেষ হলে টাকার হিসাব নেন। রাস্তায় কোনো ঝামেলা হলে পুলিশের সঙ্গে দেন-দরবার করেন লাইনম্যানরা। প্রতিটি স্টপেজেই একজন করে লাইনম্যান থাকে। এদেরও টাকার একটা অংশ দেন চালকরা। তবে চালকদের সঙ্গে বাসমালিকের সঙ্গে চুক্তি হলো দিন শেষে ট্রিপ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার। আর ট্রিপ বাড়াতে বাড়তি আয়ের আশায় অনেক সময় চালকরা নির্দিষ্ট স্টপেজের আগেই বাস ঘুরিয়ে ফেলেন বলে স্বীকার করেন তারা।
সড়কে গণপরিবহনের এসব অনিয়ম তদারকির অভাব প্রকট। রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। মাসোহারা দেওয়ায় চালকরা বেপরোয়া। আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না। প্রশ্ন আছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ ভূমিকা নিয়েও। কে তদারকি করবে? সবারই তো আয়ের প্রশ্ন। কে টানবে গণপরিবহনের লাগাম?





