তানভীন সুইটি সফল নারী উদ্যোক্তা। ছোটবেলায় থেকেই সখ হাতের কারুকাজে। এখন পাথর ও পুথির তৈরি বিভিন্ন জুয়েলারি, হস্ত ও কুটির শিল্পপণ্য তৈরি করছেন। পাশাপাশি ময়মনসিংহের পিছিয়ে পড়া অসংখ্য নারীকে এ কাজ শিখিয়ে স্বাবলম্বী করেছেন সফল এই উদ্যোক্তা।
উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সুইটি ডিঙ্গিয়ে এসেছেন নানা প্রতিবন্ধকতা। তবে দমে যাননি। উদ্যোক্তা হওয়ার নানা দিকে নিয়ে কথা বলেছেন তানভীন সুইটি।
প্রশ্নঃ- আজ আপনি সফল উদ্যোক্তা। এই উদ্যোক্তার হওয়ার শুরুটা কেমন ছিল?
সুইটি: ছোটবেলা থেকেই হাতে তৈরি কারুকাজে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিয়ের পর স্থানীয় দোকান থেকে একটি পাথরের মালা কিনেছিলেন। মালাটি ব্যবহারের এক পর্যায়ে ছিড়ে যায়। তারপর নিজের চেষ্টায় মালাটি আবার ঠিক করে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলি। তখনই আমার চিন্তায় আসে, আমিও এ রকম মালা তৈরি করব। এক পর্যায়ে দোকান থেকে মালা ও বিভিন্ন জুয়েলারি প্রোডাক্ট তৈরির উপকরণ কিনে নিজের বাসায় বসে বিভিন্ন জুয়েলারি প্রোডাক্ট তৈরি করতে থাকি। আশপাশের অনেকেই এসব পোডাক্ট পছন্দ করে এবং আমার কাছ থেকে কিনত। এক পর্যায়ে আমার প্রচুর অর্ডার আসতে শুরু করে। তখন আমি কাজের পরিসর বাড়াতে শুরু করি।
প্রশ্নঃ- ব্যবসার পরিসর কিভাবে বৃদ্ধি করেন?
সুইটি: ২০১৫ সালের দিকে স্বামীর চাকরির বদলির সুবাদে ময়মনসিংহ চলে আসি। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। নিজে ও কয়েকজন নারীকে দিয়ে পণ্য তৈরি করতে থাকি। এসব পণ্য বিক্রি জন্য শহরের সানকিপাড়া কাজল টাওয়ারে (ক্যান্টনমেন্ট মোড়) সুইটি জুয়েলারি অ্যান্ড ফরচুন হ্যান্ডিক্রাফটস নামে শোরুম চালু করি। এসব পণ্যের চাহিদা প্রচুর থাকায় বিক্রি বেড়ে যায়। পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন মেলায় অংশ নেই।
প্রশ্নঃ- আপনার এই চলার পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো কি ছিল?
সুইটি: এখনো কেউ চায় না মেয়েরা ব্যবসায় আসুক। আমিও চাইব কিনা আমার মেয়ে ব্যবসায় নামুক। আমি না আসলে হয়ত ভাবতাম কেন আমার মেয়ে ব্যবসা করবে। আমার বাবাও তার জামাইকে বলে আমার মেয়েকে তো তুমি বাজারে নামিয়েছ। তাহলে বোঝেন তারা কিভাবে বিষয়টাকে নিয়েছেন। এছাড়া আমার বাবা ও শশুরকে আমার শোরুম উদ্বোধনের জন্য ডাকছিলাম, তারা আসেনি। কাছের মানুষগুলোর কাছে তেমন সহযোগিতা পাই না। শুরুর দিকে স্বামীর কাছ থেকেও বাধা আসত। তবে আগের চেয়ে এখন একটু ইতিবাচক।
প্রশ্নঃ- লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি?
সুইটি: এক্ষেত্রে আমাদের মনসিকতার পরিবর্তন করা জরুরি। পাশাপাশি নারীদেরও আস্থা অর্জন করতে হবে যে আমরা ঘর সামলেই পাশাপাশি অন্যকিছুগুলো করব। পরিবার-সমাজে বিশ্বাস জন্মাতে না পারলে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্নঃ- আপনার পথ চলায় সবচেয়ে কার বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন?
সুইটি: এক্ষেত্রে আমার মনের জোরই বেশি। এখনও আমি বাধা পাই। তবে হাল ছাড়িনি। এত মানুষের যেখানে সাড়া পাচ্ছি, তাহলে কেন আমি এটা বাদ দিব। আমার যত কষ্ট পরিশ্রম হোক আমি করব। আমার কাজটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমি চাই আমার মত আর দশজন মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসুক।
প্রশ্নঃ- নারীর উন্নয়নে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কতটুকু জরুরি?
সুইটি: খুবই জরুরি। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কিন্তু খরচ বেশি। তাই মা-বাবা, স্বামী, ভাইয়ের কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে গেলেই কিন্তু জানতে চাইবে আমি টাকা দিয়ে কি করব। কী করব জানাতে হবে তারপর টাকা। নিজে আয় করলে কিন্তু আর হাত পাততে হয় না। আমি মনে করি প্রতিটি মেয়েকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া উচিত।
প্রশ্নঃ- আপনার বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
সুইটি: আমার স্বামী সরকারি চাকরির ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতাম। এখন আমিও প্রতিমাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করছি। সব মিলে কিন্তু আমরা এখন ছেলেমেয়ে ও সংসার চালাতে এক লাখ মত খরচ করি। এটা কিন্তু স্বামীর একার আয়ে সম্ভব ছিল না। তাই আমি গর্ববোধ করি সংসারে অবদান রাখার জন্য।
প্রশ্নঃ- ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
সুইটি: এক নামে সবাই সুইটি হ্যান্ডিক্রাফট চিনবে। সবার হাতে হাতে আমার পণ্য তুলে দিতে চাই। এছাড়া আমাকে আরো দশ জন মেয়ে যেন ব্যবসায় আসে।
প্রশ্নঃ- নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
সুইটি: প্রতিবন্ধকতা থাকবে। তবে সফল হতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজন মনোবল। নারীর তো পদে পদে বিপদ। এসব মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে সফলতা একদিন অবশ্যই আসবে।
প্রশ্নঃ- সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
সুইটি: আপনাকেও ধন্যবাদ।




