ছেলেদের চুল পড়ে যাওয়া বা টাক সমস্যা নিয়ে অনেকেই বিব্রত বা বিরক্ত। চুলপড়ার কারণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে বা হচ্ছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে বলা হয়, চুলপড়ার কারণ বংশগত বা হরমোনজনিত। ছেলেদের চুলপড়া বা এনড্রোজেনিক এলোপিসিয়ার মূল কারণ ডাইহাইড্রক্সি টেস্টোসটেরন বা ডিএইচটি। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

ডিএইচটি একটি পুরুষ হরমোন। পুরুষ হরমোন টেস্টোসটেরন থেকে আলফারিজাকটেজ এনজাইমের সাহায্যে তৈরি হয় ডিএইচটি। ডিএইচটি চুলের ফলিকলের গোড়ায় গিয়ে তাদের বৃদ্ধি রোধ করে এবং রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। এভাবেই চুল পড়তে শুরু করে। সুতরাং ডিএইচটি বেড়ে গেলে চুল পড়তে শুরু করে এবং একপর্যায়ে টাকের সৃষ্টি হয়। তবে এক্ষেত্রে শুরুতে চিকিৎসা নিতে চাইলে হোমিওতে এর পার্মানেন্ট চিকিৎসা রয়েছে।

চুল বৃদ্ধি বা গজানোর জন্য একটি চক্র বা চুলের জীবনচক্র রয়েছে। এই চক্রের তিনটি পর্যায় রয়েছে। বৃদ্ধির সময়কে বলে এনাজেন। এনাজেন ২ থেকে ৬ বছর স্থায়ী হয়। মাথার ৯০ শতাংশ চুল এনাজেন বা বৃদ্ধি হতে থাকে। দ্বিতীয় পর্যায় ক্যাটাজেন। এটি একটি অস্থায়ী পর্যায়। এটি কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। সর্বশেষ পর্যায় টেলোজেন। টেলোজেন ২ থেকে ৪ মাস স্থায়ী হয়। এ সময় কিছু চুল পড়ে যায় এবং ওইসব ফসিকল থেকে নতুন চুল গজায়। টেলোজেন পর্যায় দীর্ঘতর হলে চুল বেশি পড়ে যায়। এ ছাড়া চুলের ফসিকল শুকিয়ে গেলে নতুন চুল নাও গজাতে পারে।

সাধারণত ছেলেদের মাথার সামনের দিকে চুল পড়তে থাকে। দুই পাশ থেকে পড়ে যায় এবং মাথার উপরিভাগেও চুল পড়তে থাকে। তখনই বুঝতে হবে যে এটা টাকের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে এবং বয়সটা সাধারণত দেখা যায় ২০ বছরের আশপাশে। ২০ বছরের কয়েক বছর আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। এই জিনিসটা যখন শুরু হয়, তখনই বুঝতে হবে এটি টাকের পর্যায়ে চলে গেছে। ২০ বছরের আশপাশেই যে পড়ে তা নয়, ৩০ বছরের পরেও পড়ে। ত্রিশের পরে কারো কারো পড়া শুরু করে এবং আস্তে আস্তে টাক পড়তে থাকে। তবে ২০ বছরে যেটা হয়, সেটা অতিরিক্ত মাত্রায় হতে থাকে। ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সে টাক প্রকাশ পায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলি এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেশিয়া। এন্ড্রো মানে হলো হরমোন। আর জেনেটিক মানে হলো বংশগত। সুতরাং অনেক সময় হরমোনের কারণেই হয়ে থাকে। আর বংশগত কারণে হয়। যাদের টাক পড়ে, প্রায়ই দেখা যায়, তার বংশের কারো না কারো টাক আছে। আবার যে বয়সটা বললাম, সেই বয়সে হরমোন এন্ড্রোজেন বেশি মাত্রায় প্রকাশ পায়। যার জন্য এই টাক পড়া শুরু হয়। মূলত হরমোন ও বংশগত কারণের জন্য চুল পড়ে। তা ছাড়া এই দুটো কারণ ছাড়াও অজ্ঞাত কারণেও টাক পড়ে থাকে যা উপরে বলা হয়েছে। তাছাড়া এর মধ্যে বিশেষ কারণ হল আজকালকার ছেলেদের লাইফস্টাইল।

চুলপড়া রোধ করার কার্যকর উপায় কি ?

চুল পড়া সমস্যায় প্রতিকার হিসেবে নিচের অভ্যাসগুলো করতে পারেনঃ

➤চুল পড়া বন্ধে খাবার:- মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, ডাল ইত্যাদি প্রোটিনযুক্ত খাবার রাখবেন প্রতিদিনের খাবারের তলিকায়। প্রোটিনের অভাব হলে শরীরের মতো চুলের স্বস্থ্যেও কিন্তু বড় ক্ষতি হয়ে থাকে।

➤গরম পানির ব্যবহার: – চুলে গরম পানি ব্যবহার করবেন না, গরম পানি চুলকে রুক্ষ ও নষ্ট করে। ফলে কুসুম কুসুম গরম পানি দিয়ে ভালো করে চুল ধুয়ে, সবশেষে ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলবেন। তাছাড়া মাথা ঘষে ঘষে মুছবেন না। এতে চুলে টান পড়ে ও চুল ছিড়ে যায়।

➤প্রাকৃতিক শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার:- যারা চুলে অতিরিক্ত শ্যাম্পু করেন, তারা কোনোভবেই রাসায়নিক পদার্থ দেয়া শ্যম্পু কিংবা কন্ডিশনার ব্যবহার করবেন না। কন্ডিশনারে ওয়াক্স এবং সিলিকন জাতীয় উপাদান থাকে। তাই কন্ডিশনার চুলের গোড়ায় না দিয়ে শুধু চুলের ওপর দেবেন। কন্ডিশনার চুলের গোড়াকে তৈলাক্ত করে, ফলে মাথার ত্বকে বাতাস ঢুকতে বিঘ্ন ঘটে।

➤স্ট্রেইটনার:- কোকড়া বা এলোমেলো চুল সোজা করতে শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও স্ট্রেইটনার বা চুলের ইস্তিরি ব্যবহার করেন। গরম স্ট্রেইনার যে চুল নষ্ট করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, বিশেষ করে এর নিয়মিত ব্যবহারে চুল পড়তে পারে।

➤হেয়ার ড্রায়ার:- চুল ধোওয়ার পর শুকিয়ে ফেলাই চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কিন্তু গরম বাতাসে নয়। হেয়ার ড্রায়ারের ঠান্ডা বাতাসে চুল শুকালে চুল পড়া এবং ভাঙার সম্ভাবনা কমে।

➤জিঙ্ক এবং বায়োটিনযুক্ত খাবার:- যাদের মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো কারণে চুল পড়ে, তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে জিঙ্ক এবং বায়োটিনযুক্ত বা ভিটামিন বি-৬ যুক্ত খাবার খাবেন। তবে সেটা কখনোই ৮-১২ সপ্তাহের বেশি না হয়। আর হ্যাঁ, মানসিক চাপ এড়িয়ে চলুন এবং হাসিখুসি থাকুন। এই পরামর্শ দিয়েছেন জার্মান ত্বক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টফ লিবিশ।

➤চুলে রঙের কম ব্যবহার:- আগে পাকা চুলকে ঢাকতেই মূলত চুলে রং ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এ যুগের ছেলে-মেয়েরা মূলত ফ্যাশন করতেই খুব কম বয়স থেকে চুলে নানারকম রঙের ব্যবহার করে। চুলের রঙে থাকা রাসায়নিক পদার্থ চুল রুক্ষ করে, ফলে চুল ভেঙে যায় এবং পড়তে শুরু করে। তাই যতটা সম্ভব চুল কম ‘ডাই’ করবেন।

➤পেট পরিষ্কার রাখুন:- পেট বা অন্ত্র এবং চুলের গোড়া একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ পেটের সমস্যাও চুলে প্রভাব ফেলে। কাজেই চুলকে বাঁচাতে পেট পরিষ্কার রাখুন। তাছাড়া সুস্থ, সুন্দর চুলের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করুন।

➤খুসকিকে দূরে রাখুন:- চুল পরিস্কার রাখতে হবে চুলের গোড়ায় যাতে তৈলাক্ত খুসকি না হয়, কারণ খুসকি হলে মাথা চুলকায় এবং তার ফলেও চুল পড়ে।

➤ চিরুনির ব্যবহার:- মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন। বড় চুলের ক্ষেত্রে প্রথমে নিচের অংশ এবং ক্রমান্বয়ে উপরের দিক থেকে এবং সব শেষে পুরো চুল – এভাবে আঁচড়ানোর চেষ্টা করুন, এতে চুল ভাঙার হার কমবে।