মাঠে লাইনে দাঁড়ানো সবার হাতে একটি করে সাদা কাগজের ফরম। খুব যত্ন নিয়ে কাগজটি পূরণ করেছে তারা। শুধু একজন খেলোয়াড়ের কোনো ফরম নেই। থাকবে কী করে, ছেলেটির যে হাতই নেই! দুর্ঘটনা তাঁর হাত দুটি কেড়ে নিয়েছে। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

তাই আর দশজনের মতো ফরম হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি। হাত নেই, কিন্তু চোখে স্বপ্ন তো আছে; আর আছে ফুটবল খেলার জন্য দুটি পা। তাই পুঁজি করে ছেলেটি দাঁড়িয়েছে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লাইনে—ফুটবলের ‘ট্রায়াল’।

হ্যাঁ, ছেলেটার একটা নাম আছে, মাসুদ শাহরিয়ার। কিন্তু তার আসল পরিচয় হচ্ছে চরম শারীরিক অসংগতি নিয়েও বাকি স্বাভাবিক ফুটবলারদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সাহস আর স্বপ্নেই।

১৭ বছর বয়সী মাসুদ থাকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে। সোমবার তাঁকে দেখা গেল রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস যুব দলের ট্রায়ালে। হাত না থাকায় দৌড়ানোর সময় যেখানে শরীরের ভারসাম্য রাখাই সমস্যা, মাসুদ সেখানে ট্রায়াল ম্যাচে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেল। স্ট্রাইকার হওয়ায় খেলার সময় আর দশজনের মতো হাত উঁচু করে সতীর্থদের কাছে বল চাওয়ার সৌভাগ্য তার নেই। কিন্তু টগবগে তরুণ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তার একটু কেঁপে কেঁপে দৌড় যেন সেই ‘বিশ্বাসঘাতক’ ভাগ্যকে উল্টো চোখ রাঙানির হুমকি!

মসজিদের ছাদে নামাজ পড়তে গিয়ে মাসুদ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। পরিণামে দুটি হাতই কেটে ফেলতে হয়। মাসুদ তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। হাত ছাড়া জীবন চালাতে কষ্ট হলেও অনেকেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ফুটবলে ভালো করতেও যে হাত দুটি দরকার হয়—এ কথা শুধু ফুটবলাররাই বুঝবেন। জীবন মাসুদকে এখানেই পিছিয়ে দিয়েছে।
প্রথমে হতে চেয়েছিল ক্রিকেটার। স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তি হবে। কিন্তু হাত না থাকলে পেশাদার ক্রিকেটার হবে কীভাবে! তাই সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বেছে নিল ফুটবল। ধানমন্ডির মাঠে রচিত হলো তার দ্বিতীয় স্বপ্নের বীজতলা।

কয়েক বছরের অনুশীলন পুঁজি করে এবার প্রথমবারের মতো রহমতগঞ্জ ও বসুন্ধরা কিংসের যুব দলের ট্রায়ালে মাসুদ নাম লিখিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যই যার সঙ্গী, তার কি ছেঁড়ে ভাগ্যের শিকে! জায়গা হয়নি কোনো দলেই। করুণা করে উভয় ক্লাবের কর্তারাই ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, এটাই তার সান্ত্বনা। তবু হাল ছাড়তে রাজি নয় মাসুদ, ‘আজ হয়নি, কাল হবে। কাল না হলে পরের দিন হবে। তবে হবেই। আমি বড় ফুটবলার হবই। আমার হাত না থাকাটা কোনো বাধা হতে পারে না।’ লক্ষ্যটা পাহাড়সমান বাধা হলেও হার মানতে রাজি নয় মাসুদ। ঠিক যেভাবে এগিয়ে চলছে পড়ালেখায়। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে বাণিজ্যিক বিভাগে নবম শ্রেণিতে পড়ছে মাসুদ। পা দিয়ে লিখেই ক্লাসের অন্য ছাত্রদের চেয়ে কম যাচ্ছে না ছেলেটি।

বাবা নেই। তিন ভাইবোনের মধ্যে মাসুদই ছোট। পরিবারের সবার পরম স্নেহের হাতই আছে তার মাথায়। কিন্তু মা-ই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বাড়ির ছোট ছেলেটির জন্য। খেলার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার মা সব সময়ই নাকি মনে করিয়ে দেন, ‘হারা যাবে না বাবা। কোনো বাধায় যেন তোমাকে হারিয়ে দিতে না পারে।’
মাসুদ মায়ের কথাটি বুকে ধারণ করেই এগিয়ে চলে। তার মা যে বলেছেন, হারা যাবে না…।