হাসপাতালের বেডে শুয়ে আট বছরের মেয়ে সূচনার দিকে খেয়াল রাখতে স্ত্রী রিমাকে বলেছিলেন শাহীন। মেয়ে কেমন অাছে বারবার জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষবারের মতো সেই প্রিয় মেয়েকে দেখে যেতে পারলো না নেপালে বিমান বিধ্বস্তে আহত শাহীন ব্যাপারী। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ বার্ন ইউনিটের ২য় তলায় আইসিইউ’র সামনে শাহীনের স্ত্রী রীমা আক্তার ক্রন্দনরত অবস্থায় স্বামী শাহীন ব্যাপারী স্মৃতি স্মরণ করে বলছিলেন, মেয়ের চিন্তা করতে করতে চলে গেল শাহিন। মেয়ের কাছে বাবার কথা কী বলব? আমার মেয়ের কি হবে এখন। আমার মেয়েকে আমি কী জবাব দিব। তার স্বপ্নই ছিল সূচনা কে নিয়ে।

শাহীনের স্ত্রী রিমা বলেন, তারে কেনো এখানে রাখল। এখানে কেউ বাঁচে না। সবাই মইরা যায়। অামার শাহীনেরও তাই হইছে। কেউ তারে বিদেশ নিয়া চিকিৎসার ব্যবস্থা করল না। অামি এখন কী করি। সেতো অামারে একা রাইখা চইল্যা গেল। অামার মেয়ে এতিম হইয়া গেল গো।

উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৮ মার্চ তাকে দেশে আনা হয়েছিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় আহত ষষ্ঠ বাংলাদেশি শাহীনকে ব্যাপারীকে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ২১ মার্চ প্রথম দফায় এবং ২৫ মার্চ দ্বিতীয় দফায় তার অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর থেকে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (অাইসিইউ) রাখা হয়েছিল।

সোমবার দুপুর ২টার দিকে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢামেক বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (অাইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।এরপর ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলেন চিকিৎসকরা।

সোমবার বেলা বিকাল ৪ টা ৪০ মিনিটে আহত হওয়ার পর ১৫ দিন পর না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। নেপাল ট্র্যাজেডির খাতায় যুক্ত হলো আরও এক প্রাণ।

এর আগে শাহীন বেপারীর অবস্থার অবনতির খবর পেয়ে তার স্বজনরা বার্ন ইউনিটে অাসেন। তারা চিকিৎসকদের কাছে বারবার অনুরোধ করছিলেন শাহীনকে উন্নত চিকিৎসায় দেশের বাইরে নেয়ার জন্য।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়নের বান্দেগাঁও গ্রামের মৃত সাইফুল ইসলামের ছেলে শাহীন বেপারী। স্ত্রী ও আট বছর বয়সী এক কন্যা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বসবাস করতেন তিনি।

বাংলাদেশ শান্তি সংঘের সদস্য এবং পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকার বিক্রমপুর গার্ডেন সিটিতে মেসার্স করিম অ্যান্ড সন্স নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার শাহীন বেপারী।

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিএস-২১১ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। ৬৭ যাত্রী ও চার ক্রুসহ ওইদিন দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানটি বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫১ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন নেপালেই। আর আহত হন ১০ বাংলাদেশি। প্রথমে আহতদের নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকায় আনা হয়। কয়েকজনকে নেয়া হয় সিঙ্গাপুর।

উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর মধ্যে বাংলাদেশি ৩২ জন, নেপালি ৩৩ জন, একজন মালদ্বীপের ও একজন চীনের নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে পুরুষ যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩৭, নারী ২৮ ও দুই শিশু ছিল।