স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল ঢাকার দোহারের মধুরচর গ্রামের হেলাল উদ্দিনের (৩৮)। ২০০৯ সালে ১৭ জনের কাছ থেকে এক কোটি ১০ লাখ টাকা নিয়ে জমি কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করেন। এছাড়া তার ব্যবসায় অংশীদার ছিল ৮-১০ জন। যাদের কাছ থেকে তিনি টাকা নিয়েছিলেন তাদের যথাসময়ে লভ্যাংশ পৌঁছে দিতেন।
সব মিলে ভালোই চলছিল। কিন্তু একপর্যায়ে ব্যবসায়িক অংশীদাররা তার টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়, আর দেনার দায়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন হেলাল। আর্থিক দুরবস্থার মধ্যেই স্ত্রীও তাকে তালাক দিয়ে চলে যায়। সাড়ে ছয় বছর বয়সী একমাত্র সন্তানও এখন স্ত্রীর কাছে। কোটি টাকা, আর সংসার হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছেন হেলাল উদ্দীন।
হেলাল বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল ছিল আমার জন্য খুবই ভালো সময়। লোকজন আমাকে ব্যবসার জন্য টাকা দেয়। ওই সময় বিনিয়োগকারীদের ৯০ লাখ টাকা লভ্যাংশ দিই আমি। কিন্তু ব্যবসার পার্টনাররা আমার ও অন্য মানুষের টাকা মিলে প্রায় ৩০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি ২২ লাখ টাকা নিয়ে পালায় মুক্তি কবির। ওই বছরের ১৫ মে ২৪ লাখ টাকা নিয়ে পালায় কাজী গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ রুবেল। ২০ ডিসেম্বর ১৩ লাখ টাকা নিয়ে পালায় নুরুল আমিন। মাসে দুই লাখ টাকা লাভ দেয়ার আশ্বাস দিয়ে আমার ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ২০০ নিয়ে পালায় আবদুর রহমান সরকার ও কুতুব আলী। মুসফিকুস সালেহীন সুয়েজ ২ লাখ টাকা, সুজন দেড় লাখ টাকা এবং আবদুর রহিম সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। এছাড়া জমির বায়না বাবদ একজনকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। সেটাও ফেরত পাইনি।
হেলাল বলেন, ২০১৪ সালে ছোট ভাই মারা যাওয়ার পর দেনাদাররা মানসিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। কেউ কেউ পুলিশ দিয়েও নির্যাতন শুরু করে। আবদুল আউয়াল নামে একজন নির্যাতন করে আমার কাছ থেকে ৫০ টাকার খালি স্ট্যাপে সই ও তিনটি সাদা চেক নেন। মাহমুদুল ৩০০ টাকার খালি স্ট্যাম্পে জোর করে সই নেন। যাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ছিল না তারাও এখন আমাকে হয়রানি করছেন। এরই মধ্যে ২০১৫ সালের ২৯ মে স্ত্রী আমাকে তালাক দিয়ে চলে গেল। বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হেলাল বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে।
বিদেশে লোক পাঠাতে টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষী হয়েও চরম বিপদে পড়েছেন বলে জানান হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় মাসুদ রাজধানীর লালমাটিয়ায় ট্রাভেলস এজেন্সির এমডি রাকিবুল হকের কাছে ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেন। সাক্ষী হিসেবে হেলালকে ওই অফিসে নিয়ে যায় মাসুদ। মাসখানেক পর মাসুদকে ট্যুরিস্ট ভিসায় ইন্দোনেশিয়া পাঠায় রাকিবুল। সেখান থেকে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাতে না পেরে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে দেশে ফিরিয়ে আনে। এরপর দীর্ঘদিনেও মাসুদকে ইউরোপে পাঠাতে পারেনি, টাকা ফেরত চাইলে টালবাহানা শুরু করে রাকিবুল। এ ঘটনার জেরে ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মাসুদের নেতৃত্বে মাহবুব, চঞ্চল, জনি ওরফে হাতকাটা জনি, সুমন এবং আইস্তাহ ওরফে লালমিয়া মোড়লসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী স্থানীয় মেঘলা বাজার থেকে হেলালকে অপহরণ করে মাসুদের বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এ সময় হত্যার হুমকি দিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের একটি খালি চেকে (সিডি/এ ১২৯১৬৬৯) হেলালের স্বাক্ষর নেয়া হয়।
হেলাল উদ্দিন বলেন, ছাড়া পেয়ে আমি মাসুদ গংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করি। মামলার প্রাথমিক তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তদন্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এখন তদন্ত করছে সিআইডি। আশা করছি, প্রভাবমুক্ত হয়ে সিআইডি প্রতিবেদন দাখিল করবে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, চেকে স্বাক্ষর দেয়ার পরও মাসুদ গং হেলালকে আটকে রাখে এবং রাত ২টার দিকে পাশের একটি পুকুরপাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে গাছের সঙ্গে বেঁধে ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করে। জীবন বাঁচাতে হেলাল টাকা দিতে রাজি হলে ঘরে নিয়ে ফের বেঁধে রাখে। পরে হেলালের বোন থানায় খবর দিলে অপহরণের ৩২ ঘণ্টা পর পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। এ সময় আসামিরা পালিয়ে যায়। পরে ওই খালি চেকে টাকার অঙ্ক বসিয়ে (২০ লাখ) সেটি ডিজঅনার করায় মাসুদ এবং চেক ডিজঅনারের মামলা করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, রাকিবুলকে দেখে আমি টাকা দেইনি। আমি টাকা দিয়েছি হেলালের হাতে। হেলাল কার কাছে টাকা দিয়েছে সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। তাই হেলালকে চাপে রেখে তার কাছ থেকে চেক নিয়েছি। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি বারবার ডিজঅনার হয়। এ কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছি।





