প্রখ্যাত শিশু-কিশোর ও বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক, পদার্থবিদ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর গত শনিবার হওয়া আক্রমণের প্রতিক্রিয়াস্বরুপ তাঁর কন্যা ইয়েশিম ইকবাল নিজের ব্লগে একটি আবেগঘন লেখা প্রকাশ করেছেন।
‘Response to the attack on my father’ শিরোনামের ইংরেজি এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে গত ৬ মার্চ (মঙ্গলবার)।
ইয়েশিম নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি অ্যান্ড সোশ্যাল ইন্টারভেনশন প্রোগ্রাম থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী সম্পন্নের কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের প্রথম মানসিক সহায়তা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধমূলক হেল্প লাইন ‘কান পেতে রই’ এর অন্যতম উদ্যোক্তা।
আমরা সবাই বিস্মিত এবং অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। যারা এই লেখাটি পড়ছেন তাদের অনেকের মতো আমিও গভীর দুঃখের অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি। প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে লক্ষ্য করছি আমাদের দেশটা নিরাপদ না। যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমি বেড়ে উঠেছি সেই ক্যাম্পাসে আমার বাবা ছুরিকাহত হয়েছেন। তাও এমন সময়ে যখন তিনি একটা অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন! একজন বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন ইয়েশিম আপু? এতসব ঘটার পরেও কেন তোমরা এখানে থাকবে?”
মনে হচ্ছে অনেক মানুষ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে। যাই হোক। আমি সবার উদ্দেশে কিছু বলতে চাই। মূলত খুব বেশি কষ্ট না করে আমি আমার বাবার কাছ থেকেই কিছু কথা ধার করে বলতে চাই। কারণ আমি জানি সুস্থ হবার পর তিনি ঠিক কি বলবেন। দেখুন, কোনো অবস্থাতেই হতোদ্দ্যম হওয়া যাব না। যে জিনিসগুলো আপনার কাছে সুন্দর আর ভালো মনে হয়, আপনার দেশের জন্য আপনি মনপ্রাণ দিয়ে যা চান এবং যেগুলো এখনো হাতের মুঠোয় আসেনি সেগুলো পাবার আগ পর্যন্ত আপনি সংগ্রাম বন্ধ করে দিতে পারেন না।
আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই খুব সহজে আসেনি। আজকের পৃথিবীতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যেসব জিনিস আপনি উপভোগ করছেন- স্বাধীনভাবে হেঁটে চলার জন্য একটা পথ, খাবার, ডাক্তার, স্কুলে যাবার অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার, জীবনকে চালিয়ে নেবার জন্যে একটা কাজ; এমনকি রিকশায় করে আপনজনের সাথে ফুচকা খেতে যাওয়া; এইসব ছোটখাটো প্রতিটা আনন্দের মুহূর্তের জন্য আপনার আগে যে এসেছে, সে যুদ্ধ করেছে। কোনো কিছুই বিনামূল্যে আসেনি, কোনো কিছুই সহজে আসেনি। কিছু মানুষ এগুলোর জন্য দিনের পর দিন যুদ্ধ করেছে। এই যুদ্ধটা করেছে আমার বাবা-মা’র মতো মানুষ এবং অবশ্যই আমার আর আপনার মতোই কেউ।
আমরা যা যা পেয়েছি সেগুলোর প্রতিটি বিন্দু উপভোগ করা আমাদের অধিকার এবং একইসঙ্গে দায়িত্ব এবং এটা আমাদের দায়িত্ব যেসব জিনিস আমরা এখনো পাইনি সেসবের জন্য যুদ্ধ অব্যাহত রাখা। সম্ভবত আমাদের সন্তানরা সেটা পাবে।
যখন সময়টা অনেক কঠিন হয়ে যায়, রাগে-ক্ষোভে-কষ্টে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হয় (আমি জানি কারণ আমি নিজেই সেই জায়গাতে আছি); তখন সমস্যা থেকে পালিয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নেবেন না। খুব গভীর গভীর করে একটা নিঃশ্বাস নিন। নিজের চারপাশে তাকান আর আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাহসগুলো এনে আবার নিজের মধ্যে জড়ো করুন। এই সাহস হয়তো কঠিন পথের বাধা পেরিয়ে আসতে গিয়ে আপনি হারিয়ে ফেলেছিলেন! মেরুদণ্ড শক্ত করে মাথা তুলে শিনা টান করে দাঁড়ান। তারপর আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে খুঁজে নিন।
আমি খুব ভালো করেই জানি, আমি এই কথাগুলো বলতে পারছি কারণ আমার বাবা জীবিত আছেন এবং ভালো আছেন। ইতোমধ্যেই এই সিমেস্টারের পাঁচটা কোর্স কিভাবে শেষ করবেন সেটা নিয়ে কথা বলছেন আমার বাবা। এই মুহূর্তে আমি সেইসব পরিবারের কথা চিন্তা করছি যাদের প্রিয়জনরা এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক কন্যা আছেন যাদের বাবা আর সুস্থ হয়ে ফিরেননি। আমি আপনাদের কথাও ভাবছি।
আমি এই দেশে আছি কারণ এখানে থাকতে আমি পছন্দ করি। এই জায়গাটা আমি এমন নির্মম ঘটনা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করি না। এসব ঘটনা এবং যারা এসব ঘটায় তারা হচ্ছে সমস্যা। এই সমস্যা আমাদের জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে। এই সমস্যাগুলো টিউমার কিংবা ফাঙ্গাসের মতো। সমস্যাগুলো বিশ্রী। এই সমস্যাগুলো বেড়ে উঠেছে কারণ আমরা এগুলো সমাধানের জন্যে যথেষ্ট কাজ করিনি। এই সমস্যাগুলোর মূলোৎপাটন করতে হবে আমাদেরকে।
এই দেশটা এই সমস্যাগুলোর জন্য না। এই দেশটাতে রয়েছে ছায়ানট আর শিল্পকলা একাডেমির মতো আনন্দের জায়গা, যেখানে আমি হৃদয়ের গান খুঁজে পাই। ইতিহাসের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত স্বত্ত্বেও এই ছোট দেশটা বিজ্ঞানে, শিল্পে, সাহিত্যে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে! এই দেশেই আছে একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আমি অনেক কিছু শিখি। এখানে আমার বাবার সহকর্মীরা রাতের খাবার টেবিলে বসে তাদের পরবর্তী পাঠ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে। এখানে আমার বন্ধুরা আমাকে ছোট মাছের কাবাব খাওয়ানোর জন্যে জোরাজোরি করে, কারণ এই খাবারে অনাগত বাচ্চা স্বাস্থ্যবান হয়। এই দেশটা আমার মা এবং বাবার- যারা কোনো ভুল করে না। যারা কোথাও যাচ্ছেন না!
আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষত, তাদের কাছে যারা সেই মুহূর্তে আমাদের পাশে ছিলেন এবং খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে আমার বাবার যত্ন নিয়েছেন। সারাদেশে যারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আপনাদের প্রতিবাদের শব্দ আমার মনে শক্তি জোগায়। গত কয়েকদিনে যারা আমাদের জন্য ভালোবাসার অপার সমুদ্র খুলে দিয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ। আপনারাই আমাদের ভরসার জায়গা।
কোনো ভুল করবেন না। আমরা কোথাও যাচ্ছি না।





