আমি নিজেকে পরিবর্তনের কথা চিন্তা করি। আমার নিজের ভেতরে একটা উদ্যোগ আছে যে, আমি সবাইকে দেখিয়ে দিতে চাই আমরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী না,

আমাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়। আমাদেরও প্রতিভা আছে, আমরাও পারি। বিউটি পার্লারে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। আগে যে মানুষগুলো আমাদের ধিক্কার দিয়েছে, অন্যরকমভাবে দেখেছে, এখন তারাই ভালো মন্তব্য করে বলে হিজড়ারা কাজ পারে, কাজ করে।’ কথাগুলো সাভারে বাস করা এক হিজড়ার। স্থানীয় একটি বিউটি পার্লারে কাজ করেন তিনি।

জন্মের পর বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন মো. নাসিম। কুমিল্লার মো. নাসিম এখন সবার কাছে বিউটিশিয়ান নাসিমা নামে পরিচিত। ১৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে নাসিমাদের মতো ঘুরে দাঁড়ানো মানুষদের সহযোগিতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সবার জন্য বাড়িয়ে দিন ভালোবাসার হাত’ স্লোগানে মেহেদি উৎসব। সাদাকালো কমিউনিটি বেজড অর্গানাইজেশনের আয়োজনে এবং উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মহুয়াতলায় (নতুন কলা ভবনসংলগ্ন) এ মেহেদি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেহেদি উৎসব।
মেহেদি উৎসবে বিউটিশিয়ান নাসিমার সঙ্গে আলাপ হয় প্রিয়.কমের। তিনি বলেন, ‘আমাদের যখন হিজড়া বলে সম্বোধন করে তখন আমাদের খুব কষ্ট লাগে। আমাদের দেখে অনেকই ভয়ে দৌড় দেয়। আমাদের কেউ করুণা করুক বা আমাদের কেউ নিন্দা করুক তা আমি চাই না।’

‘আমারও হাতে মেহেদি পরতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু মন থেকে ভালোবেসে আমার হাতে মেহেদি পরতে কেউ বলবে না। আমি কাগজের ফুল। আমার ভেতরে কোনও ঘ্রাণ নেই। কাগজের ফুল থেকে তো কেউ ঘ্রাণ নিতে আসে না। এ সমাজের মানুষ আমাদের বুঝতে চায় না, বা বুঝতে পারে না।’

নাসিমা জানান, ছোট বেলায় অবহেলার শিকার হয়েছেন পরিবারে। পরিবার ছেড়ে আসার পর শেষ আশ্রয় হয় গুরুমার কাছে। সেখানকার দিনগুলোতেও তাকে অবহেলা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে লড়ে যেতে হয়েছে। কিন্ত এখন দিন ঘুরেছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, হয়েছেন স্বাবলম্বীও। এখন আর কেউ বাঁকা চোখে তাকায় না, কারও কাছে গিয়ে হাত পাতা লাগে না।

নাসিমা কাজ করছেন সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত মাওলানা শপিং কমপ্লেক্স-এর উত্তরণ-২ বিউটি পার্লারে। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্য তিনি তৃতীয়। বেড়ে উঠেছেন অন্য সব সাধারণ পরিবারের মতো একটি পরিবারে। পরিবারের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে নাসিমা বলেন, ‘আমরা যারা এই ধরনের মন মানসিকতার মানুষ, আমরা প্রথম সাফার করি পরিবার থেকে।’

নাসিমা বলেন, “আমাদের মেয়েলি আচরণের কারণে পরিবার আমাদের গ্রহণ করে না। আমার কারণে আমার ভাই বিয়ে করতে পারবে না, আমার কারণে আমার বোনের বিয়ে হবে না। আমার ভাই যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত তখন সবাই বলত ‘অ্যাই তোর ভাইকে দেখতে মেয়েদের মতো লাগে’। আমার ভাই পরে এসে আমাকে র্টচার করে, নানা ধরনের বকাঝকা করে। সংসারে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেহেদি উৎসব।
নিজের পছন্দের কথা বলতে গিয়ে নাসিমা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদেরও ভালো লাগার বিষয় থাকে। আমরা মেয়েদের পছন্দ করি বান্ধবি হিসেবে। অন্য কোনও চিন্তা আসে না। অনেক সময় ছেলেদের প্রতিও আমাদের একটা আকর্ষণ থাকে বন্ধু হিসেবে। চলার জন্য বা কথা বলার জন্য। কিন্তু পরিবার এ বিষয়গুলো গ্রহণ করে না। তারাও বুঝে যে আমার জায়গা সেখানে না। তাদের বোঝা হয়ে থাকতে হয়।’

নাসিমা বলেন, ‘আমার বয়স যখন ১৫, তখন আমি বাড়ি ছাড়া হই এবং আমার কমিউনিটির লোক খুঁজি। হিজড়া গুরুমার কাছে আমার ঠাঁই হয়। আমি কখনো গাড়িতে টাকা পয়সা তুলিনি। আমি বিয়ে বাড়িতে নাচ গান করেছি, দোকানে দোকানে টাকা তুলে ১৮টি বছর আমি আমার পেট চালাইছি। বিগত দুবছর যাবৎ আমি বিউটি পার্লারে আছি।’