কাতারে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের বেতন বেড়েছে। শুধু বেতনই নয় বেড়েছে ওভারটাইমের মজুরিও। দালালের সংখ্যাও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এজন্য কমেছে ভিসার মূল্য। আগে কোম্পানির ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও আগের তুলনায় সেই অভিযোগ এখন নেই বললেই চলে।
আগে পেশাগত অভিজ্ঞতা না নিয়ে অনেকে কাতারে যেতেন ফলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতেন কর্মীরা। তবে এখন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরাই যাচ্ছেন ফলে হরানিও প্রায় নেই বললেই চলে। রাক কাজ সম্পর্কে দক্ষতা থাকার জন্য তাদের ফলে তাদের বেতনও বাড়ছে।
দূতাবাস কর্তৃক ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়ন করার পদ্ধতি চালু করায় ইতিবাচক এসব পরিবর্তন হয়েছে দেশটির শ্রমবাজারে। ফলে বাংলাদেশি কর্মীরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনগত সহায়তাও পাবেন সহজেই। সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে কাতারের দোহায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং।
দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ২৩শে জানুয়ারি পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কাতার গমনেচ্ছু পুরুষ কর্মীদের ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়নের নির্দেশনা থাকায় দূতাবাস স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করছে। ফলে এসব ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। দূতাবাসের এই ভিসা এবং চুক্তিপত্র সত্যায়নের সুফল পরিপূর্ণভাবে পাওয়ার জন্য বিএমইটি’র ম্যান পাওয়ার ক্লিয়ারেন্স প্রদানের সময় প্রত্যেক কর্মীর চুক্তিপত্রের একটি কপি সঙ্গে রাখারও পরামর্শ দিয়েছে শ্রম উইং। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়নের কারণে কাতারের শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তাই এই পদ্ধতি অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে চালু করা সম্ভব হলে সেখানেও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
শ্রম উইংয়ের ওই চিঠির সূত্রে জানা গেছে, দূতাবাস ভিসা এবং চুক্তিপত্র সত্যায়ন করার ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। ভিসা এবং চুক্তিপত্র সত্যায়নের জন্য ন্যূনতম মজুরি মানার বাধ্যবাধকতা থাকায় ইতিমধ্যে কিছু কোম্পানি বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য মাসিক মূল বেতন ১০০ থেকে ২০০ কাতারি রিয়াল বৃদ্ধি করেছে। ফলে ওভারটাইমসহ অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দূতাবাসের নিয়মানুযায়ী শুধুমাত্র নিয়োগকর্তা বা তার প্রতিনিধি ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়নের জন্য দাখিল করতে পারেন। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আর এই মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভিসার মূল্য আগের তুলনায় বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। চুক্তিপত্র সত্যায়িত করতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এতে নিয়োগকর্তার নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার, মোবাইল নাম্বার এবং লেবার ক্যাম্পের ঠিকানা থাকতে হয়। ফলে বাংলাদেশি কর্মীরা সহজেই তাদের নিয়োগকর্তা এবং আবাসস্থল চিনতে পারছেন।
আগে কাতারে যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রায়ই দূতাবাসে আসতেন। নতুন এই পদ্ধতি শুরু হওয়ার পর ঠিকানা না পেয়ে দূতাবাসে সহযোগিতা নিতে আসা কর্মীর সংখ্যা নেই বললেই চলে।
আগে ইঞ্জিনিয়ার পেশায় অনেক সময় ৫ম শ্রেণি পাস বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অশিক্ষিত কর্মী কাতার যেতেন। যাওয়ার পর পেশা অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় তারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতেন। এতে করে দেশের ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু দূতাবাস ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়ন করায় উপযুক্ত কর্মে উপযুক্ত কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ারদের শিক্ষাগত সনদ উপস্থাপন সাপেক্ষে ইঞ্জিনিয়ার পেশার ভিসা সত্যায়ন করা হচ্ছে। এতে করে নিয়োগকর্তারাও প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ার পাওয়ায় বেতন ভাতা বেশি দিচ্ছে।
দূতাবাস কর্তৃক এই সত্যায়িত চুক্তিপত্র কাতারে বাংলাদেশি কর্মীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় অন্যতম প্রধান ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে কাজ করবে। চুক্তিপত্রে বেতন ভাতা এবং অন্যান্য বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত থাকায় তা কাতারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এবং উপযুক্ত শ্রম আদালতে কনক্লুসিভ প্রুভ বা চূড়ান্ত প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করবে। ফলে আইনগত সহায়তা পাওয়া সহজ হবে তাদের জন্য। শ্রম উইং দূতাবাসের ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়নের পুরোপুরি সুফল পেতে প্রত্যেক কর্মীকে জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কর্তৃক ম্যান পাওয়ার ক্লিয়ারেন্স দেয়ার সময় চুক্তিপত্রের এক কপি কাছে রাখারও পরামর্শ দেয়।
এ ব্যাপারে অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, কাতারে কিছুদিন আগেও অনেক সমস্যা ছিল। কিন্তু নানাবিধ সমস্যার কারণে সেখানে অন্যান্য দেশ থেকে কর্মী পাঠানো এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। তাদের কাফালা সিস্টেমও কর্মীবান্ধব ছিল না। কিন্তু বর্তমানে কাফালা সিস্টেম রিফর্ম করে দূতাবাস ভিসা ও চুক্তিপত্র সত্যায়িত করে।
তিনি বলেন, দালালের দৌরাত্ম্য কমলেও একেবারে নির্মূল হয়ে যায়নি। আমরা চাই, এটা জিরোতে চলে আসুক। তিনি আশা করেন, অন্যান্য দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কাফালা সিস্টেম রিফর্ম করলে একইভাবে পরিবর্তন আসবে।





