এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করার পর তিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। তিন স্থানেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মেধাবী মেয়েটি।
সমাজকর্ম বিষয়টি পাওয়ার কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেন। তার দু’চোখে স্বপ্ন বিসিএস-এ শিক্ষা ক্যাডার হবেন। শিক্ষকতা তার খুব পছন্দ। তবে তাকে ঢাকায় রেখে লেখাপড়া চালানোর সামর্থ্য ছিল না দিনমজুর বাবার। ঘরে তার বড় বোনটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ছোট ভাইটিও লেখাপড়া করছে। মা-বাবা নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। একটি টাকাও পরিবারের কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ যে নেই তার। তবুও দৃঢ় মনোবলে এগিয়ে যান মেয়েটি। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন। উপবৃত্তির টাকা এবং টিউশনি করে জুগিয়েছিলেন আগের লেখাপড়ার খরচ। এবারও ডাচ বাংলা ব্যাংকের মাসিক আড়াই হাজার টাকার বৃত্তি মিলে গেল।
শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। সদরঘাট এলাকায় মেসে থেকে, দুটি টিউশনি করে কোনোমতে চলছিল। ক’দিন পরেই এলো পথচলায় বড় বাধা, বাবার অকাল মৃত্যু। সংসারে মেয়েটি ছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নেই। তবুও থামেননি তিনি। মাকে গরু-ছাগল পালন করে টেনেটুনে সংসার চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আর নিজের আয়ের সামান্য টাকা থেকে ছোট ভাইটির লেখাপড়ায়ও সাহায্য করতে শুরু করেন। টাকা জমাতে পায়ে হেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন। অনেক বেলাই না খেয়ে উপোস করেছেন। সেই বোনের আস্থার মূল্য রেখেছে ভাইটিও। বোনের মতোই ভালো ফলাফল করে সুযোগ পেয়ে যান রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দায়িত্ব বাড়ার এই সময়ই কমতে শুরু করলো সুযোগ।চার বছর হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেলো মেয়েটির ব্যাংকের শিক্ষাবৃত্তি। আবারো বড় বাধা। সামনে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। ছুটে গেছে টিউশনি। মেসের খরচও জোগানো যাচ্ছে না। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না মেয়েটি। হতাশা ঘিরে ধরে তার চারপাশ। চাপা স্বভাবের মেয়েটি তার এই সংকটের কথা সহপাঠী, শিক্ষকদেরও বলেননি।
দিশেহারা মেয়েটি একদিন ব্যাগ গুছিয়ে গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা দেন। ট্রেনে চড়ার জন্য রিকশায় করে কমলাপুরে যান। টার্মিনালে ঢোকেন। কিন্তু এরপর কোথায় কীভাবে ট্রেন খুঁজছিলেন তা মনে নেই তাঁর। রেল লাইনের ওপর মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি। তখনো তাঁর জ্ঞান ছিল। তবে শক্তি খাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। চোখের সামনেই ট্রেন এসে তাঁর দু’টি পা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রাণে বেঁচে গেছেন, তবে এবার থেমে গেছে সংগ্রামী মেয়েটির পথচালা। তার ঠিকানা এখন হাসপাতালে শয্যা।
উপরের বর্ণনা কোনো সিনেমা নাটকের ঘটনা নয়, এ মর্মস্পর্শী কাহিনী বাস্তব, সত্য। আর সংবাদমাধ্যমে শেষের দুর্ঘটনাটির খবরও জেনেছেন অনেকে। রবিনা খাতুন (২৩)। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অষ্টম সেমিস্টার (চতুর্থ বর্ষ) ছাত্রী। গত ২৮ জানুয়ারি কমলাপুরে ট্রেনে কাটা পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার দুটি পা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২৬ নম্বর শয্যায় কাতরাচ্ছেন তিনি। হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, রুবিনাকে দেখতে এসে তাঁর জীবনের গল্প শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন সবাই। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা বলে ধারণা করা হলেও পরে রুবিনা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা শুনে দুর্ঘটনার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হতাশা ও শারিরিক দুর্বলতার কারণে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রেললাইনে পড়ে যান রুবিনা। শেষ মুহূর্তে ট্রেন দেখলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। তবে রুবিনাকে এভাবে থেমে যেতে দিতে চান না তাঁর মা ও সহপাঠীরা। দরিদ্র মেধাবী মেয়েটির উন্নত চিকিৎসা ও কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।
গত রবিবার রুবিনার শয্যাপাশে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরাই পালাক্রমের তার সেবাযত্ন করছেন। শিক্ষকরাও বারবার এসে খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন। কথার শুরুতেই ছোট ভাইয়ের জন্য আক্ষেপ করে কাপা গলায় রুবিনা বলেন, ‘আমার কী হলো, এখন কী হবে? জানি না। আমার ভাইটা আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমার মতো কষ্ট করলে ও পড়বে কীভাবে?’ ‘আমি সারাক্ষণ লেখাপড়া করি। বিসিএস দিতে চাই। শিক্ষা ক্যাডার হতে চাই। এখন কী পারবো ভাইয়া…?’ ছলছল চোখে রুবিনার প্রশ্ন। উত্তরে এ প্রতিবেদক বলেন, ‘অবশ্যই পাড়বে। তুমি হাটতে পারবে। সব কাজই করতে পারবে। আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে। আমার এক সহকর্মীও তোমার মতো দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি এখন আমাদের সঙ্গেই কাজ করছেন।’ উজ্জল হয়ে ওঠে রুবিনার মুখমন্ডল, ‘অনেক টাকাতো লাগবে…।’
পাশেই বসে থাকা রুবিনার মা রহিমা বেগম তখন আচলে মুখ লুকিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন, ‘আমাক লক্ষী মাইয়াডা না খাইয়া চিন্তায় শেষ হইয়া গেল। লেখাপড়ায় ভালা। নিজেরাই খরচ জোগাড় করে। এখন আর পারতাছিল না। ও আমাক আশা-ভরসা। আর হেই মাইয়া এখন এই অবস্থা। কী হইবো?’
রহিমা জানান, তাদের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার শান্তিনগর গ্রামে। তার স্বামী রবিউল ইসলাম ছিলেন দিনমজুর। সাড়ে তিন বছর আগে (২০১৪) তিনি মারা যান। এরপর গবাদি পশু পালন করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছিলেন তিনি। তাদের বড় মেয়ে জুলেখা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ছেলে রুবেল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ছেলে-মেয়েরা টিউশনি করে এবং বৃত্তির টাকায়ই লেখাপড়া করছিল।
রুবিনা জানান, তিনি স্থানীয় বিনয়পুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি এবং কালীগঞ্জ মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। বৃত্তি ও উপবৃত্তির টাকার সঙ্গে টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জোগান। ঢাকায় থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য ডাচ বাংলা ব্যাংকের মাসিক আড়াই হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি পান তিনি। গত ডিসেম্বর মাসে ওই বৃত্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। বোনের মতোই ফলাফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান রুবেল। রংপুরে থেকে লেখাপড়া করা ভাইকে মাঝে-মধ্যে ৫০০/১০০০ টাকা দিতেন রুবিনা। দুটি টিউশনি করে পাচ্ছিলেন মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকা। রুবিনা বলেন, বৃত্তি শেষ হওয়ার পর কীভাবে চলবেন বুঝতে পারছিলেন না তিনি। এপ্রিলে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। তাই বেশি টিউশনিও করা যাবে না। এ নিয়ে হতাশায় পড়ে যান। এক সময় বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়ি যাওয়ার পথে রেললাইনে গিয়ে কীভাবে তিনি পড়ে গেলেন এবং ট্রেনে কাটা পড়লেন তা বুঝতেই পারছেন না।
রুবিনা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শামছুজ্জামানের অধীনে চিকিৎসাধীন। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, মেয়েটির দু’টি পা’ই হাটুর কাছ থেকে কেটে গেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্ত দেওয়ার পর এখন অবস্থা স্থিতিশীল। দু’টি পায়ে ড্রেসিং ও অস্ত্রোপচার করে ঘাঁ শুকিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এ চিকিৎসায় আমাদের কাছে কমপক্ষে এক মাস যাবে। এরপর তিন-চার মাস লাগবে প্রতিস্থাপন বা পুনর্বাসনসংক্রান্ত চিকিৎসায়। তিনি আরো বলেন, কৃত্রিম পা হলে মেয়েটি সহায়তা নিয়ে হাটতে পারবে। চিকিৎসাটি ব্যয়বহুল। তবে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ফাইবারের ভালো পা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আমরা যোগাযোগ করছি। আর্থিক সহায়তা পেলে মেয়েটিকে পুনর্বাসন করা সম্ভব।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবুল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে রুবিনা তার আজকের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়ে তাঁরা দুই ভাইবোন মেধার সাক্ষর রেখে দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত রুবিনার ফলাফল অত্যন্ত ভালো। একটি দুর্ঘটনায় মেয়েটি আজ সবার সাহায্যপ্রার্থী। সবাই চেষ্টা করলে আমরা হয়তো তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারব।’
রুবিনার সহপাঠী ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পালাক্রমে রুবিনার পাশে থাকছি। ওকে আমরা থেমে যেতে দিতে চাই না। সমাজের সামর্থ্যবানদের সহায়তা পেলে রুবিনা হাটতে পারবে। সংসারের হালও ধরতে পারবে।’
রুবিনার জন্য ডাচ বাংলা ব্যাংকের নয়াবাজার ব্রাঞ্চের সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর-১৩৬১৫১৭৪৩৪৪, মো. আবুল হোসেন ও মোসা. রুবিনা খাতুন, একাউন্টে সহাযোগীতা পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। যোগাযোগ করা যাবে: ০১৯৩৯০৫০৯৬৬, ড. অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন, চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। একই মোবাইল ফোন নম্বরে বিকাশে টাকা পাঠানো যাবে।





