বৈদেশিক কর্মসংস্থান আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন পারস্পরিক সমৃদ্ধির ধারায় প্রবাহিত। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হওয়া অভিবাসনের এ যাত্রায় বাংলাদেশ ৪০ বছর পেরিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশী প্রবাসী আর অভিবাসী কর্মী মিলে এ সংখ্যা এখন প্রায় এক কোটি। ১৬৫টি দেশে কর্মসংস্থান লাভ করেছে বাংলাদেশী কর্মীরা। গত বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল সাত লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত লাখ ৩৬ হাজার ৪৬১ জন কর্মসংস্থান লাভ করেছে এবং বছর শেষে তা ১০ লাখ হতে যাচ্ছে, যা হবে সর্বকালের রেকর্ড।
প্রতি বছর বাংলাদেশের যুব শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ নতুন মুখ।তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আনুষ্ঠানিক (ফরমাল) সেক্টরে প্রতি বছর কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার এক লাখেরও কম।
অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) সেক্টরে নিয়োগ এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে তিন-চার লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়। নিয়মিত বিদেশে ১০ লাখ কর্মীর কর্মস্থানের মাধ্যমে মোট যুবশক্তির নিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
যুবসমাজের কর্মসংস্থানের অভাবে সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি, হতাশা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম সুফল হলো ‘রেমিট্যান্স’। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্র্রায় দেশের রিজার্ভ সমৃদ্ধ হচ্ছে, দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো হচ্ছে আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়, তা হলো অভিবাসী কর্মীদের পরিবারের জীবনমান উন্নত হচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে আর দারিদ্র্যের অবসান হচ্ছে।
সুষ্ঠুভাবে বিদেশে চাকরি লাভ করা ও যথাযথভাবে সার্থক অভিবাসন সম্পন্ন করে দেশের ফিরে আসার ওপর নির্ভর করে তার আর্থিক উন্নতি। এ জন্য প্রয়োজন প্রত্যেক অভিবাসী কর্মীর সচেতনতা, সঠিকভাবে খোঁজখবর নিয়ে বিদেশ যাওয়া এবং অভিবাসনের লাভক্ষতি হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়া।
পাশাপাশি নতুন বেশ কিছু দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মীরা এগুলোতে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হতে পারেন। গত ৪০ বছর ধরে যেসব দেশ বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিয়োগ করছে তাতে দেখা যায়, ১৬৫টি গন্তব্য দেশ থাকলেও মাত্র ৯টি দেশে মোট জনশক্তির ৯২ শতাংশ চাকরি লাভ করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদী আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাহরাইন, কুয়েত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও জর্ডান।
আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নিয়োগে মাত্র ৪২ শতাংশ দক্ষ, বাকিরা আধা দক্ষ বা স্বল্প দক্ষ; তাদের অভিবাসন ব্যয়ও অনেক বেশি হয়ে থাকে। দক্ষ কর্মী দেশের সম্পদ, বিদেশেও তাদের চাহিদা বেশি। তাদের অভিবাসন ব্যয় অনেক কম, পক্ষান্তরে বেতন বেশি, কর্মপরিবেশও হয় উন্নত। সরকার বিশেষত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো দক্ষকর্মী তৈরি করার জন্য অনেক উদ্যোগ নিয়েছে।
অধিকহারে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে দেশের সব এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ। এখন প্রয়োজন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সচেতনতা ও আগ্রহ। যেনতেন প্রকারে বিদেশে যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, ভুল পথে নিয়ে যায় আর ক্ষতির সম্মুখীন করে দেয়; দেশও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। সুবিধাজনক ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে তার অভিবাসন সার্থক ও অর্থ আয় অনেক বেশি হতে পারে; মুক্ত থাকতে পারে প্রতারণার ফাঁদ আর বিবিধ সমস্যা থেকে।
নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করে অনেক ক্ষেত্রে সার্থকতাও অর্জন করেছে। নতুন গন্তব্যের মধ্যে যোগ হয়েছে বেলারুশ, পালাউ, পোল্যান্ড, সুইডেন, পাপুয়া নিউগিনি, সিশেলস, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কঙ্গো, সুদান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, অ্যান্ডোরা, ভানুয়াতু, সেøাভেনিয়া, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস। ৫২টি দেশে শ্রমবাজার জরিপ করে দক্ষ কর্মীর কর্মসংস্থান চাহিদা নিরূপণের কাজ করছে জনশক্তি ব্যুরো।





