রাজধানীতে নতুন পদ্ধতিতে ওয়েবসাইট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে দেহব্যবসা। একটি ওয়েবসাইট কিংবা একটি পেজ খুলে অনলাইন এসকর্ট সার্ভিস (অনলাইন যৌনব্যবসা) নামে দেহ ব্যবসা চালাচ্ছে অনেকেই। আর এতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন পেশার নারী-পুরুষেরা।
গুগলে ঢাকা এসকর্ট সার্ভিস কিংবা বিডি এসকর্ট সার্ভিস লিখে সার্স দিলেই দেখা মিলে শতাধিক ওয়েবসাইটের। এসব ওয়েবসাইটে দেখা যায়, প্রত্যেকটি সাইটেই তরুণ-তরুণীদের ছবি ও তাদের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া। বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বয়স, চুলের রং, উচ্চতা, চোখের রং এবং সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন।
উপরোক্ত বর্ণনায় খদ্দেরদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য লেখা হয় নানা উত্তেজক কথা। জীবনকে উপভোগ করতে চাইলে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে সিটি অব লাভ নামের একটি ওয়েবসাইটে এক তরুণীর ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, ফোন সে ক স ও ইমো অডিও সে ক স প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা, ভিডিও সে ক স প্রতি ঘণ্টা ১০০০ টাকা। রিয়েল সে ক স আলোচনা সাপেক্ষে। তবে একসঙ্গে দুইজনের বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।
কিছু ওয়েবসাইটে রয়েছে এলাকা ভিত্তিক সার্ভিস। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে রাজধানীর, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকা।
বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটের ঠিকানায় যোগাযোগ করে জানা যায়, ওয়েবসাইটগুলোর মূল সার্ভিস দুই ধরনের। হোম সার্ভিস ও ওয়েবসাইট মালিকের স্থানে যাওয়া। হোম সার্ভিস নিতে হলে খদ্দেরকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত টাকার ৫০ শতাংশ পাঠাতে হবে। এরপর কর্মী বাসায় আসবেন। তার কাছেই দিতে হবে বাকি টাকা। এক্ষেত্রে কর্মীকে নির্বাচন করতে হবে অনলাইনের ছবি দেখে।
অন্যদিকে দালালদের নিজস্ব স্থানে গিয়েও সেবা নিতে পারবেন খদ্দেররা। এক্ষেত্রে খদ্দেরকে প্রথমে তাদের দেয়া ঠিকানায় যেতে হবে। সেখানে থাকা কর্মীদের পছন্দ করে ঘণ্টা চুক্তিতে মিলনে লিপ্ত হতে পারবেন তারা।
উভয়ক্ষেত্রেই টাকার পরিমাণ সর্বনিম্ন দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অনেকক্ষেত্রে মাদকেরও ব্যবস্থা করে দেন দালালরা। সেজন্য অবশ্য খরচ করতে হয় বাড়তি টাকা।
প্রতারিত একাধিক ব্যক্তি জানান, ওয়েবসাইটে এসকর্ট সার্ভিস নেয়াটা নিরাপদ মনে করে যোগাযোগ করেছিলেন তারা। কিন্তু ওয়েবসাইটগুলোর চাহিদা মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠিয়ে পরবর্তীতে কোনো কর্মীরই দেখা পাননি। অন্যদিকে কর্মী বাসায় আসার পর ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে নিয়ে গেছেন টাকা-পয়সাসহ সর্বস্ব।
এছাড়া ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করে যারা দালালদের দেয়া ঠিকানায় গেছেন তাদের অনেকেই সঙ্গে থাকা সকল কিছু দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি লজ্জার ও বেআইনী হওয়ায় তারা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে এসব ডোমেইন বন্ধে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি)মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এসব ওয়েবসাইট বন্ধে কাজ করছে। একইসঙ্গে অবৈধ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার। ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসকর্ট সার্ভিস ছড়িয়ে পড়ায় খুব সহজেই অবৈধ কর্মে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ নিতে গিয়ে প্রতারিতও হচ্ছেন অনেকে।
সম্প্রতি সময় এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর শতকরা ৮০ শতাংশ শিশুই বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এসব শিশুদের মধ্যে শতকরা ৬৪ শতাংশ ব্যবহার করছে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য। দেশে ক্রমাগত ইন্টারনেট ব্যবহারের বৃদ্ধি, বিশেষ করে শিশু তথা ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে যখন ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে তখন অনলাইনে এসকর্ট সার্ভিস বাড়তে থাকার বিষয়টি সমাজের জন্য খারাপ ফলাফল বয়ে আনবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রসঙ্গত, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে রাজধানী ছাপিয়ে এই ব্যবসা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে আঞ্চলিক শহরগুলোতেও। ‘অনৈতিক’ এই ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে প্রতারিতও হচ্ছেন অনেকে। তবে অবৈধ এ ব্যবসা এখনই নজরদারির মধ্যে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে এগুলো সমাজের জন্য খুবই খারাপ ফলাফল বয়ে আনতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবে এগুলো বন্ধের জন্য এরইমধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।





