সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে চলমান ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে’র প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন ধনকুবের প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালালের বাবা প্রিন্স তালাল বিন আবদুলআজিজ।

১০ নভেম্বর থেকে তিনি না খেয়ে প্রতিবাদ করছেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই অনশনকারী প্রিন্সকে দেশটির সৌদি রাজপরিবারের প্রথম ‘অভ্যন্তরীণ সংস্কারক’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

৪ নভেম্বর শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রথম দিনেই আটক হন কয়েকজন মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী, প্রিন্স ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তাদের আটক করে রাখা হয় পাঁচ তারকা হোটেল রিৎজ কার্লটনে। দুর্নীতির অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার শর্তে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় তাদের। অনেকেই সেই প্রস্তাব মেনে এরইমধ্যে মুক্তি পেয়েছেন। তবে টুইটারের মতো বড় বড় কোম্পানিতে বিনিয়োগকারী ধনকুবের আলওয়ালিদ বিন তালাল মুক্তির প্রস্তাব না মেনে মামলা চালানোর কথা জানান। এই অভিযানে আটক রয়েছেন আলওয়ালিদের আরও দুই ভাই।

তিন ছেলের আটকের প্রতিবাদে এই অনশন শুরু করেছেন প্রিন্স আবদুলআজিজ। একমাসের অনশনে ১০ কেজি ওজন হারিয়েছেন তাদের ৮৬ বছরের এই বৃদ্ধ।

সৌদি বাদশাহ সালমানের এই সৎ ভাইয়ের শরীরে গত সপ্তাহে নল দিয়ে খাওয়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন চিকিৎসকরা। রাজধানী রিয়াদের বাদশাহ ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই প্রিন্সের শারিরীক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাকে দেখে আসা স্বজনেরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাকে দেখে আসা এক স্বজন মিডলইস্ট আইকে বলেছেন, নিজের খাবার গ্রহণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চান না তিনি। গত নভেম্বরে এক বোনের মৃত্যুর পর তার সঙ্গে দেখা করেছেন সৌদি বাদশাহ সালমান। ওই সময় হুইল চেয়ারে বসা তালাল বিন আবদুলআজিজের হাতে ঐতিহ্য অনুযায়ী হাতে চুম্বন এঁকে দেন সৌদি বাদশাহ।

তবে ওই সময় এই বিষয়ে কোনও আলাপ হয়নি বলে মিডলইস্ট আইকে নিশ্চিত করেছেন ওই স্বজন। তিনি জানান সৌদি বাদশাহের কাছে যাওয়ার সক্ষমতাকে আব্দুলআজিজ তার তিন ছেলের মুক্তির জন্য ব্যবহার করতে চান না।

তবে ওই স্বজন বলছেন, তবে কেন তিনি খাবার গ্রহণ বন্ধ করেছেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বলেন, ‘আমরা তাকে ভালোভাবে জানি আর কেন তিনি এমন করছেন। তার ক্ষুধা না থাকার চিকিৎসাশাস্ত্রীয় কোনও কারণ নেই।’

এক মাস আগে প্রতিবাদ শুরুর সময়ে তালাল বন্ধুদের বলেছিলেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযোনের আড়ালে যুবরাজ বিন সালমানের নিপীড়নের প্রতিবাদ ভদ্রভাবে করার অধিকার তার রয়েছে।

প্রিন্স আব্দুলআজিজ তার স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য সুপরিচিত। বাদশাহ সৌদের শাসনামলে ১৯৫৩ থেকে ৬৪ পর্যন্ত সময়কালে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ৬০-এর দশকে তিনি স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানোর আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে রেড প্রিন্সের পরিচিতি পান। তবে রাজপরিবার ওই আন্দোলনকে প্রত্যাখান করে তাকে কায়রো নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। পরে মায়ের মধ্যস্ততায় দেশে ফেরেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরে সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার বহু আগেই দেশের নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন আব্দুলআজিজ। এক সাক্ষাৎকারে ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘সৌদি নারীরা অবশেষে তাদের অধিকার পেলো। এই অগ্রযাত্রা থামলে চলবে না, বরং আমাদের তা বাড়াতে হবে।’

একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের জন্য লড়াই অব্যাহত রেখেছেন প্রিন্স আবদুলআজিজ। তার দাবি, সংবিধানে ক্ষমতার বণ্টনের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।

২০০৭ সালে মিসরীয় আল মিহওয়ার টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অনশনকারী প্রিন্স বলেছিলেন, ‘আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি ক্ষমতার বণ্টন, কার্যনির্বাহী, আইন প্রনয়নের সভা আর বিচার ব্যবস্থায়। ১৯৯২ সালে বাদশাহ ফাহাদ প্রবর্তিত সৌদি সংবিধানে এসব বিষয় সন্নিবেশিত ছিলো। তাতে কর্তৃপক্ষগুলোর পৃথকীকরণের উল্লেখ ছিলো। আর আমরা এখন দাবি তুলছি সেই কর্তৃপক্ষগুলোকে হতে হবে স্বাধীন।’

তিন ছেলে আটক
তালাল বিন আবদুলআজিজের তিন ছেলে আটক রয়েছেন। তার ছেলে কিংডম হোল্ডিংয়ের চেয়ারম্যান আলওয়ালিদ বিন তালাল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী। ব্লুগবার্গ ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, তার সম্পদের পরিমাণ উনিশশো কোটি ডলার। যুবরাজ সালমানের অভিযানের প্রথম দিন থেকেই আটক আছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যুবরাজের দুর্নীতিবিরোধী কর্তৃপক্ষ তার মুক্তির বিনিময়ে পুরো কিংডম হোল্ডিং লিখে নিতে চায়। তা দিতে অস্বীকার করে আসছেন আলওয়ালিদ। তবে এ বিষয়ে কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে বিচারের মুখোমুখি হতে চান তিনি।

আবদুলআজিজের আরেক ছেলে খালিদ নিজের ভাই আলওয়ালিদের মুক্তির জন্য তদবির করছিলেন। সূত্রের বরাত দিয়ে মিডলইস্ট মনিটর বলছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালানোর এক পর্যায়ে আটক হন তিনি। তাদের সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে মারামারির অভিযোগ এনেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

প্রিন্স আবদুলআজিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসা স্বজনরা বলছেন, যুবরাজ সালমানের রাজপরিবারের সদস্য আর ব্যবসায়ী নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই। রাজপরিবারের কোনও কোনও অংশ দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। তবে তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন বলে জানান ওই স্বজন। তার দাবি, এই অভিযানে গণহারে আটক হয়েছেন বিন আজিজ আর বিন তালালের পরিবারের সদস্যরা।

দশকের পর দশক ধরে রাজপরিবারের অন্য অংশ দুর্নীতিবাজ তকমা পেয়ে আসছেন, এমন অভিযোগ এক টিভি সাক্ষাৎকারে নিজেই করেছেন এক প্রিন্স।মিডলইস্ট আই-কে ওই সূত্র বলেন, ‘কোথায় খালিদ বিন সুলতান, মোহাম্মদ বিন ফাহাদ? এসব তদন্তের আওতায় তারা কেন নেই? কাউকে ছেড়ে দেওয়ার আর কাউকে আটক রাখার এই বাছ-বিচারের মানদণ্ড কী?’

আতঙ্ক আর উন্মত্ততা
আলওয়ালিদ ও তার ভাইয়েরা ছাড়াও এখনও আটক রয়েছেন অনেক প্রিন্স। তাদের মধ্যে রয়েছেন তুর্কি বিন নাসের, তুর্কি বিন আবদুল্লাহ, ফাহাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুলরহমান।

আবদুলআজিজ বিন ফাহাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যায়নি। তবে অনেকেরই স্থিরবিশ্বাস গ্রেফতার এড়াতে গিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। তবে অনেকেই মনে করেন বেঁচে থাকলেও অনেকটা নিভৃতে আছেন তিনি।

সাবেক যুবরাজ মোহম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়েই নিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজের পদে বসান বাদশাহ সালমান। ধারণা করা হয় নভেম্বরে ওই অভিযান শুরুর আগেই থেকেই রাজপ্রাসাদের বাইরে রয়েছেন তিনি। অভিযানে আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়েছেন প্রিন্স মিতেব বিন আবদুল্লাহ।

ওই অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকাশ্যে বিন সালমান প্রিন্স মিতেবের হাতে চুমু খেলেও আটক থাকার সময়ে তাকে শারিরীক আঘাত করা হয়েছে। ‘নাটকে’র অংশ হিসেবে মুক্তির পর মিতেবকে রিয়াদের ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে তিনি এক সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া সামরিক বাহিনীটির সদস্যদের মধ্যে উপহারও বিতরণ করেন।

বাস্তবতা হচ্ছে বিন নায়েফ আর মিতেব দুজনকেই ‘অদৃশ্য দড়িতে’ আটকে রাখা হয়েছে। রাজপ্রাসাদের বাইরে যেতেও অনুমতি নিতে হয় তাদের। এছাড়া যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা রাজবাহিনীর সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকেন তারা। দুজনেরই ভ্রমণ নিষিদ্ধ বলেও জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি সূত্র।

তালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসা ওই স্বজন বলছেন, বিন সালমানের কর্মকাণ্ডে আল সৌদের রাজপরিবারে আতঙ্ক আর উন্মত্ততা তৈরি হয়েছে।

তবে এসব বিষয় নিয়ে মন্তব্যের জন্য তালালের পরিবারের কোনও সদস্যকে পাওয়া যায়নি।