শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ঘিরে কি ঘটতে যাচ্ছে? পর্যবেক্ষকরা সেদিকেই দৃষ্টি রেখেছেন। অফিসার ও মন্ত্রীদেরসহ নিজেকে ‘চোর’ বলার পরও ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ না করায় বিস্মিত হয়েছি। অসহায় এক মন্ত্রীর ক্ষোভ, দুঃখ ও অসহায়ত্ব উচ্চারিত হয়েছে তার বক্তৃতায়।
নুরুল ইসলাম নাহিদ যে বক্তৃতায় ঝড় তুলেছেন, সেই অনুষ্ঠান টানা ২ ঘণ্টা লাইভ প্রচার হয়েছে। তার বক্তব্যের অনেকটাই ছিল সে অনুষ্ঠান ঘিরে। বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা ও পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দায়সাড়া সংবাদ সম্মেলন প্রমাণ করেছে, তিনি চাপের মধ্যে পড়েছেন, বিচলিত হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত যে বক্তব্য পাঠ করেছেন সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের চোর বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, কর্মকর্তাদের সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ খেতে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, ঘুষ খেতে বারণ করার সাহস তার নেই। সেটিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু অর্থহীন সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য তাকে আরেক দফা বিতর্কের মুখে ফেলতে পারে। নিজের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে না। কারণ তার বক্তব্যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে এবং মানুষ শুনেছে-দেখেছে।
সরকারের সকল মন্ত্রী চোর নন, সকল অফিসারই অসৎ নন; কিন্তু সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে থেকে যেভাবে সকল মন্ত্রী অফিসারদের ঢালাও চোর বলেছেন, তাতে সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধান কতটা লঙ্ঘিত হয়েছে সেটি প্রধানমন্ত্রীসহ আইন প্রণেতা ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের এটুকু বুঝতে বাকি নেই যে, কোনো গণমাধ্যমকর্মী বা নাগরিক যদি সকল অফিসার ও মন্ত্রীদের চোর বলতেন আর সেটি গণমাধ্যমে প্রচার হতো তাহলে ৫৭ রশিতে বেঁধে নিয়ে তাদেরকে জেলে পুরতেন।
নুরুল ইসলাম নাহিদের শিক্ষাখাত টিআইবির রিপোর্টে বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত বড় খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে চলমান ব্যর্থতা চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করে আসছে। এমন কোনো পরীক্ষা নেই যেখানে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না। শিশুদের পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে নাহিদের ব্যর্থতা সংসদের ভিতরে-বাইরে সরকারকে সমালোচনার তীরে ক্ষত-বিক্ষত করেছে।
বাংলাদেশের ৪৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক প্রয়াত ও জীবিত রাজনীতিবিদগণ বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন। কখনো স্বেচ্ছায় কেউ কোনো ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেননি। একমাত্র ৯১ শাসনামলে শিল্পমন্ত্রী জহির উদ্দিন খান পদত্যাগ করে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ যদি নিজেকে চোর বললেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, তিনি চোর নন, সৎ মন্ত্রী। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার সুরক্ষা দিতে ও দুর্নীতির লাগাম টানতে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের রাজনৈতিক জীবন অনেক বড়। ছাত্র ইউনিয়নের এককালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। সিপিবি ছেড়ে গণফোরাম করেছেন। সেখান থেকে আওয়ামী লীগে এসে এমপি, মন্ত্রীই হননি; দলের প্রেসিডিয়ামেও ঠাঁই পেয়েছেন। সিলেট বিভাগে তিনিই একমাত্র আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েও সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডে নেই। তবুও ফুলটাইম মিনিস্টার নাহিদ শিক্ষাখাত থেকে মানুষের হতাশা, ক্ষোভ নির্বাসিত না করে অসহায়ের মতো ক্রন্দন করেছেন। সকল অফিসার ও মন্ত্রীদের চোর বলেছেন।
কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন কর্মকর্তাও দাঁড়িয়ে বলেননি, তিনি চোর নন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ছাড়া কেউ প্রতিবাদ করেননি। সরকারের মন্ত্রীগণ হয়তো সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে নাহিদের কাছে জবাব চাইতেই পারে। কি ঘটেছে, কি ঘটতে পারে সেটিরও চেয়ে বড় বিষয় শিক্ষামন্ত্রী নাহিদের ব্যাক্তিত্ব, আত্নমর্যাদার ও নীতিগত বিষয়টি খোলাসা হবার। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ যদি বিশ্বাসই করেন, সকল কর্মকর্তা ও মন্ত্রীগণ চোর এবং তাদের জন্য তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, তাহলে তিনি কেন পদত্যাগ করেননি? ব্যক্তিত্ব সাহস ও আত্ন মর্যাদাবোধের সঙ্গে তিনি তার বক্তব্যের বিষয় হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করলে পদত্যাগ করে নিজের ইমেজ বাড়াতেন। তবে কি ক্ষমতার মোহটুকু, মন্ত্রিত্বের লোভটুকু এতটাই আকর্ষণীয় যে একজন নাহিদের পক্ষে সেটি ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয়! একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশ হলে একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর হয় মন্ত্রিসভা থাকতো, না হয় মন্ত্রী বিদায় নিতো। যে বক্তব্য সরকার বিরোধীরা আনতে পারেনি, সেই বক্তব্য নাহিদ এনেছেন। সরকার বিরোধীদের হাতে ইস্কাপনের টেক্কা তুলে দিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বক্তব্য ধরে অনেকেই তাকে চোরের বাপের বড় গলা বলে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছেন। এই অভিযোগের মধ্য দিয়ে নাহিদ পদত্যাগ করলে তাকে এত কথা শুনতেও হতো না।





