সৌদি আরবে বেকারত্বের হার ১২.৮ শতাংশ, যার মানে বেকারের সংখ্যা আট লাখ। এই বিপুল বেকারত্ব দূর করতে সৌদি আরবে অনেক চাকরিকে সৌদিকরণ (অর্থাৎ শুধু সৌদি নাগরিকেরাই ওই চাকরি করতে পারবেন) করা হয়েছে।
এ দিকে, সৌদি আরবের জাতীয় পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি ১০ লাখে পৌঁছেছে। এক দিকে এত বিপুল বেকারত্ব, অন্য দিকে এত প্রবাসী শ্রমিক- ব্যাপারটা অদ্ভুতই বটে! অন্য দিকে, শ্রম মন্ত্রণালয় আবার চালু করেছে ‘নিতাকাত’ কর্মসূচি। এর অর্থ হলো, কোনো কোম্পানিকে তার মোট জনবলের একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা সৌদি নাগরিক দিয়েই পূরণ করতে হবে। যেসব কোম্পানি এটা মান্য করবে, সরকার তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেবে।
কিন্তু সময় যতই গড়াতে লাগল, ততই দেখা যেতে থাকে, কোম্পানিগুলো নিতাকাত কর্মসূচিকে চমৎকারভাবে পাশ কাটানো শিখে গেছে। তারা কোম্পানিতে কিছু সৌদিকে ‘চাকরি’ দিলো। তাদের বেতন কম, কাজ আরো কম। মানে, মাসশেষে বেতন নেয়া ছাড়া অফিসে তাদের কোনো কাজই নেই। এক কথায় তাদের চাকরিটাই ভুয়া। এ চাকরিতে তাদের কোনো কাজ করতে করতে হয় না, এমনকি অফিসেও আসতে হয় না।
বিশ্বব্যাংক এই কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এটা কোম্পানিগুলোর জন্য কর্মী বাছাইয়ের কোনো সুযোগ রাখেনি, বরং সৌদিদের জন্য ভুয়া চাকরির সুযোগ এনে দিয়েছে। কেবল সৌদিকরণের শর্ত পূরণ করতেই বিভিন্ন কোম্পানি এসব ভুয়া নিয়োগ দিতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, সত্যিকার চাকরি পেয়েছেন মাত্র ১০% সৌদি। অন্য কথায়, বেসরকারি খাতের দুই লাখ চাকরির মধ্যে মাত্র হাজার বিশেক আসল চাকরি পাচ্ছেন সৌদিরা। বাকিগুলো ভুয়া চাকরি।
সাবেক শ্রমমন্ত্রী মুফাররিজ আল-হাকবানির ভাষায় বলতে হয়, ‘অনেক সেক্টরে সৌদিকরণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি- এ কথা স্বীকার করতেই হবে।’ কেন এ ব্যর্থতা, জানাতে গিয়ে তিনি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সাথে ওই সব খাতের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার অভাবকে দায়ী করেছেন।
যেমন- শ্রম মন্ত্রণালয় ১০ বছর আগেই ট্যাক্সিক্যাব খাতকে সৌদিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আজ অবধি খাতটি সম্পূর্ণ সৌদিকরণ হয়নি। এটা হলে এখানেই ৬০ হাজার সৌদির কর্মসংস্থান হতো। স্বাস্থ্য খাতে সৌদিকরণের কথাই ধরা যাক। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ বলে গেছেন যে, এ খাতটি সৌদিকরণে দীর্ঘ সময় লাগবে। দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্য খাতে সৌদিকরণ যখন ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, বেসরকারি খাতে এর হার মাত্র ৮ শতাংশ।
সৌদি ডাক্তারদের ২৯ শতাংশ কাজ করেন বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে। সৌদিকরণের এ দুর্দশার কারণটি নিহিত রয়েছে কিছু কোম্পানির মনোবৃত্তিতে, যা ভুয়া সৌদিকরণের দিকে গড়িয়েছে। আমাদের অবশ্যই এ প্রবণতা প্রতিরোধ করতে হবে। সেজন্য প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো, এ কথা স্বীকার করে নেয়া যে, আমাদের একটি সমস্যা আছে এবং সেটি সমাধানে চাই কঠোর ব্যবস্থা। নিয়োগকারীরা বলেন, সৌদি তরুণ-তরুণীরা অলস, তারা কাজ করতে চায় না। কম বেতনের চাকরিতে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা পায় না। তাই এসব চাকরি করার চেয়ে তারা ঘরে বসে থাকাই ভালো মনে করে।
বোঝা যাচ্ছে, সৌদিকরণ করে, বিভিন্ন কোম্পানিকে সৌদিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য করে, বেকার সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম যা করতে হবে তা হলো, কাজ নিয়ে সৌদি তরুণ-তরুণীদের মনে যে বদ্ধমূল ধারণাটি রয়েছে তা ভেঙে দেয়া। তাদের মধ্যে পেশাগত দক্ষতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
তখন এসব প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীকে নিয়োগ দিতে যেকোনো কোম্পানিই আগ্রহ দেখাবে। কেবল তখনই আমরা উন্নত দেশগুলোর সমকক্ষ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে সমর্থ হবো।
আমাদের এ মুহূর্তের কর্তব্য হলো, ভুয়া সৌদিকরণ সর্বব্যাপী হওয়ার এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই এর মূলোৎপাটন করা। আমরা যদি এটা এখনই শেষ করে ফেলতে না পারি তাহলে তা এক সময় আমাদের সামনে অনতিক্রম্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে এমন একটি প্রজন্ম, যারা চাকরি খুঁজতে বা করতে আগ্রহী নয়; বরং কোনো কাজ না করেই বেতন পেতে চায়। এ সমস্যার একটি সৃজনশীল সমাধানই আমাদের দরকার।
সৌদি গেজেট থেকে অনুবাদ : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
নয়াদিগন্ত





