জাতীয় নির্বাচনে সিলেট সদর-১ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, এই আসনে যে দল জয়ী হয়, সেই দলটি সরকার গঠন করে থাকে। এই ক্ষেত্রে এই আসনে ভালো প্রার্থী কিংবা শক্তিশালী প্রার্থীর কোনো সমস্যা নেই বিএনপিতে। তবে সমস্যা হচ্ছে কোন সেই শক্তিশালী প্রার্থী যাকে বাছাই করবেন খালেদা জিয়া।

সিলেট সদরের এ আসনটিতে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী রয়েছে একাধিক। তাদের নিয়ে ভাবনায়ও আছেন খালেদা জিয়া। তবে এই আসনে সিলেট বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মীরা চায় খালেদা জিয়া নির্বাচন করুক। আবার কেউ কেউ প্রত্যাশা করেন তার ছেলে তারেক রহমানের সহধর্মিনী ডা. জোবায়েদা রহমান নির্বাচনে আসুক। আবার অনেকে মনে করেন, সিলেট সদর আসন থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহম্মেদ চৌধুরী মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল মোক্তাদির প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন।

এই বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, “সিলেট-১ আসনে মানুষ শক্তিশালী প্রার্থী চায়। এই আসনে জিয়া পরিবারের কেউ আসলে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে বলে মনে করেন তিনি। এর বাইরে তার ভাষ্য, ইনাম আহম্মেদ চৌধুরী যোগ্য প্রার্থী।”

তিনি আরো বলেন, “এই আসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমার দেখতে পাই, অতীতে সিলেট সদর থেকে হুমায়ুন রশীদ চেীধুরী ও সাইফুর রহমানের মতো যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়েছেন। সেই হিসেবে ইনাম আহমেদের বিকল্প কোনো প্রার্থী আছে বলে আমরা মনে করি না।

সিলেট সদরে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ আসন হওয়ায় এখান থেকে খালেদা জিয়া বা জোবায়দা নির্বাচন করলে সহজে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের যুক্তি, এ আসনে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগও বরাবরই হেভিওয়েট প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে থাকে। আগামী নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান অর্থমন্ত্রী ও সদর আসনের সংসদ সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত রয়েছেন। আগামী নির্বাচনে তার ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আব্দুল মোমিন প্রার্থী হতে পারেন। সেজন্য তিনি ভেতরে ভেতরে কাজও শুরু করেছেন। তার বিপরীতে বিএনপিও শক্তিশালী প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিলে এ আসন হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

সেই হিসেবে খালেদা জিয়াকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নিতে চায় সিলেট বিএনপি। জিয়া পরিবার থেকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান হলেও বিজয়ী হতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না বলে বিএনপি নেতা কর্মীরা দাবি করেন।

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, “ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) বা ডা. জোবাইদা প্রার্থী হলে তো কোনো কথাই নেই। তবে তারা না দাঁড়ালে এমন প্রার্থী দেয়া উচিত, যাতে আসনটিতে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করে জয় ছিনিয়ে আনা যায়।”

এদিকে জিয়া পরিবার থেকে কেউ প্রার্থী না হলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়া যেতে পারে বলে বিএনপি সমর্থকরা মনে করেন। ক্লিন ইমেজের অধিকারী দলের এ ভাইস চেয়ারম্যান এ আসনের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী বলেই তাদের ধারণা।

তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহম্মেদ চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়া অথবা জোবাইদা রহমান প্রার্থী হলে উত্তম হয়। তিনি বলেন, “সিলেটের এই আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় এখান থেকে আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অথবা জোবাইদা রহমান নির্বাচন করলে ভালো। তবে দল চাইলে আমি সদর আসনে নির্বাচন করব এবং আসনটিতে জয় লাভের চেষ্টা করবো।”

ইনাম আহমেদের প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক বলেন, “ম্যাডাম বা জোবায়দা রহমান হলেই সবচেয়ে ভালো হয়। দলের সর্বস্তরের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। তবে তাদের দুজনের কেউ প্রার্থী না হলে অন্য প্রসঙ্গ। সেক্ষেত্রে ইনাম আহমেদ চৌধুরী প্রার্থী হতে চান বলে শুনেছি। মানুষ হিসেবেও তিনি ভালো।”

ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (বাঁ থেকে)ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (বাঁ থেকে)
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইনাম আহমেদ চৌধুরী নির্বাচনের জন্য নিজ থেকে কোনো ঘোষণা দেননি। তবে জেলা বিএনপির অনেকেই তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়।

এদিকে অনেকটা ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছেন সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মালিকের ছেলে এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সাবেক এমপিপুত্র এ নেতা প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আব্দুল মোক্তাদির বলেন, “প্রার্থী হওয়া না হওয়া সম্পূর্ণ দলের সিদ্ধান্ত। দল চাইলে আমার প্রার্থী না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

দলের কেন্দ্রীয় এক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, দলীয় টিকেট পেতে তিনি দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। দলীয় প্রধানের কাছে তিনি তার এ ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।

সিলেট বিএনপির একটি অংশ মোক্তাদিরের হয়ে কাজ করছে। একটি ফাউন্ডেশনের নামে তারা মোক্তাদিরের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মোক্তাদিরও নিয়মিত এলাকায় সময় দিচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণ ছাড়াও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন তিনি।

শাহজালাল ও শাহপরানের শহর সিলেট সদর আসনটি নিয়ে বিএনপির চিন্তা ভাবনা কী জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা যে নির্বাচনে যাবো সেখানে আগে দেখতে হবে দেশের কি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কারণ আমরা বলেছি, জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। একই সঙ্গে সেই নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মোতায়ন করতে হবে। এই সব দাবি পূরণ হলেই আমরা নির্বাচনে যাব। সেই পরিবেশ পরিস্থিতিতে কখন কোথায় কাকে মনোনয় দেবো তখনই সিদ্ধান্ত হতে পারে।”

তিনি বলেন, “এই পথে আরো অনেক নেতার উত্থান-পতন হতে পারে। সেইটা দেখে আমরা মনোনয়ন ঠিক করবো। এখনই আমি বিএনপির এক নম্বর স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে মনোনয়নের বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো না।”

মনোনয়নের বিষয়ে দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, “এখনো নির্বাচন অনেক সময় বাকি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাহলে অবশ্যই এই আসনটি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে। সেই ক্ষেত্রে ইনাম আহমেদ চৌধুরী অত্যন্ত যোগ্য ব্যাক্তি। যিনি মাঠে থেকে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।”

তিনি আরো বলেন, “মনোনয়নের বিষয়ে আরো পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কারণ এই নির্বাচন দেয়ার আগে আমাদের অনেক দাবি আছে। সেই দাবিগুলো পূরণ হলেই আমার নির্বাচনে যাব।”