ঠা-া আবহাওয়া আপনার স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে- বিশেষ করে আপনার হার্টকে। শীতকালে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয়, যা ঠা-া তাপমাত্রা বা আচরণ পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। শরীর উষ্ণ রাখা আপনার হার্ট রক্ষায় সাহায্য করতে পারে। ঠা-া আবহাওয়া শরীরের তাপকে সরিয়ে দেয়, যার মানে হচ্ছে- শরীর মূল তাপমাত্রাকে যথেষ্ট উষ্ণ রাখার জন্য কঠিনতর লড়াই করে...
শীতের সময় এটা জানা প্রয়োজন যে, কীভাবে ঠা-া আবহাওয়া আপনার স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে- বিশেষ করে আপনার হার্টকে।
সায়েন্স ডেইলিতে প্রকাশিত ২৮০,০০০ জনেরও বেশি রোগীর ওপর চালানো ১৬ বছরের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, শীতকালে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয়, যা ঠা-া তাপমাত্রা বা আচরণ পরিবর্তনের কারণে হতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, 'শরীর উষ্ণ রাখা' আপনার হার্ট রক্ষায় সাহায্য করতে পারে। ঠা-া আবহাওয়া শরীরের তাপকে সরিয়ে দেয়, যার মানে হচ্ছে- শরীর মূল তাপমাত্রাকে যথেষ্ট উষ্ণ রাখার জন্য কঠিনতর লড়াই করে। বৃদ্ধ, যাদের শরীরে চর্বি কম থাকে ও তাপমাত্রা অনুভব করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের রোগীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরম্নত্বপূর্ণ।
এই প্রতিবেদনে ঠা-া আবহাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং তা থেকে হার্টকে রক্ষা করার বিষয়ে আলোকপাত করা হলো।
১. অল্প ব্যায়াম বা অনুশীলন
ঠা-া পড়ার মানে এই নয় যে, আপনি গতিশীল বা চলনশীল থাকবেন না অথবা নড়াচড়া করবেন না। সেই সঙ্গে তাপমাত্রা কমে গেলেও নিজেকে চলনশীল রাখা প্রয়োজন। ব্যায়াম বা অনুশীলন আপনার হার্টকে শক্তিশালী করে (যেমন- সব পেশি) এবং করোনারি আর্টারি রোগ ও ভাস্কুলার রোগ থেকে রক্ষায় সহায়তা করে। ডা. জেনিফার এইচ মিয়ারেস এবং 'হার্ট স্মার্ট ফর ওমেন' ও 'সিক্স স্টেপস ইন সিক্স উইকস টু হার্ট-হেলদি লিভিং'-এর সহলেখক স্টেসি ই. রোজেনের মতে, বসে না থেকে বা দাঁড়িয়ে না থেকে আপনার শরীরকে চলনশীল রাখার জন্য প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর দিকে আপনার লক্ষ্য থাকা উচিত। তাদের পরামর্শ হচ্ছে- ফোনে কথা বলা কিংবা টিভি দেখার সময় হাঁটুন, আপনার অফিস বা স্টোর থেকে দূরে গাড়ি পার্কিং করে হেঁটে কর্মস্থলে আসুন এবং প্রতিঘণ্টায় অন্ত্মত একবার আপনার ডেস্ক থেকে ওঠে কমপক্ষে এক মিনিট আপনার পা-টা সোজা রাখুন।
২. খারাপ ঘুমের অভ্যাস
আপনার ভালো থাকার জন্য রাতে ভালো ঘুম অত্যন্ত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আপনার হার্ট স্বাস্থ্যের জন্য। ঘুম আপনার হার্ট এবং রক্তনালিকে আরোগ্য ও মেরামত করে। নিয়মিত ভিত্তিতে অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। শীতের সময় আপনার কক্ষ তাপমাত্রা খুবই কম হলে তা আপনার ঘুমের প্যাটার্নে হস্ত্মক্ষেপ করতে পারে। যথাযথ বা সন্ত্মোষজনক ঘুমের জন্য আপনার থার্মোস্ট্যাটকে ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে সেটিং করার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্স্নিপ ফাউন্ডেশন। ওভারস্স্নিপ বা অতিরিক্ত ঘুম না যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। ২০১২ সালের এক গবেষণায় পাওয়া যায়, অত্যধিক ঘুম হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ঘুমের জন্য ন্যাশনাল স্স্নিপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা করম্নন- ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষের ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
৩. উচ্চ মানসিক চাপ
স্ট্রেস বা উচ্চ মানসিক চাপ আপনার হার্ট ও রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত্ম করতে পারে। স্ট্রেস হরমোন, যেমন- করটিসল ও অ্যাড্রিনালাইন এবং প্রদাহমূলক প্রোটিন সাইটোকিন ধমনিকে শক্ত করে এবং স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিউইয়র্কের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড কার্ডিয়াক কেয়ার এবং কলাম্বিয়ার ওমেনস সেন্টার ফর কার্ডিওভাস্কুলার হেলথের সহপরিচালক জেনিফার হেইথ বলেন, ছুটির দিন অনেক মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ প্রচুর পরিমাণে বাড়িয়ে দিতে পারে। আপনার মানসিক চাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো- কি কারণে স্ট্রেস বৃদ্ধি পাচ্ছে তা শনাক্ত করা। তারপর মানসিক চাপ কমানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করম্নন। শীতকালে আপনি একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা অনুভব করলে কাউকে ডাকুন। মিয়ারস এবং রোজেন ধ্যান ও কল্পনার মতো শিথিলায়ন পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেন, যা উদ্বেগ ও কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউরের তীব্রতা কমাতে পারে। তারা কার্যকর মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি জানার জন্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতো নামকরা ওয়েবসাইট ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
৪. ফ্লুর ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, শরৎকাল ও শীতকালে ফ্লুর ভাইরাস সর্বাধিক কমন। ফ্লু অত্যন্ত্ম সংক্রামক এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে এটি জড়িত। আপনার হৃদরোগ থাকলে কিংবা কোনো স্ট্রোক হয়ে থাকলে সিজনাল ভ্যাকসিন নেয়া গুরম্নত্বপূর্ণ। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন শুধু ভ্যাকসিন নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছে, যেমন- পাবলিক স্পেস থেকে আসার পর সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া, জীবাণু ছড়ানো প্রতিরোধ করার জন্য চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা। আপনার কাশি বা হাঁচির সময় টিসু্যপেপার দিয়ে নাক ও মুখ ঢাকার মাধ্যমে আপনি অন্যদের রক্ষা করতে পারেন- ব্যবহারের পর টিসু্যপেপার ফেলে দিন এবং মেডিকেল সেবার প্রয়োজন ছাড়া অসুস্থ থাকাকালীন সময় ঘরে অবস্থান করম্নন।
৫. শ্রমসাধ্য কার্যকলাপ
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি হেলথের কার্ডিওলজিস্ট রিচার্ড কোভাক্স বলেন, আপনার ইতোমধ্যে একবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে কিংবা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি থাকলে, আপনার ঝুঁকি ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জেনে নেয়া উচিত। ঠা-া আবহাওয়ার সময় কিছু কার্যকলাপ পরিহার করম্নন, যেমন- বেলচা দিয়ে উত্তোলন বা কাজ করা, বরফে হাঁটা এবং ঝড়ো বা শৈত্যময় আবহাওয়ায় ড্রাইভিং করা- এসব কাজ হার্টে স্ট্রেস বাড়াতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের সতর্কীকরণ উপসর্গ সম্পর্কে অবগত আছেন কিনা নিশ্চিত হয়ে নিন, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট এবং বুকের অস্বস্ত্মি। আপনার শোভেলিং বা বেলচা দিয়ে কাজ করার প্রয়োজন পড়লে, ডা. অ্যান্ড্রম্ন ফ্রিম্যানের পরামর্শের আলোকে বলা যায়, সকালে প্রথমেই শোভেলিং করবেন না, কারণ সকালে রক্তজমাটের সম্ভাবনা বেশি থাকে, নিজেকে প্রস্তুত করতে সময় নিন এবং হাতে বেলচা নেয়ার আগে নিজেকে চলনশীল রাখুন। শোভেলিংয়ের আগে ওয়ার্মআপ করম্নন, হাত-মাথা-মুখ ঢাকার জন্য উপযুক্ত পোশাকে সজ্জিত হোন, স্থান পরিবর্তন করে শোভেলিং করম্নন এবং হার্টের বোঝা হ্রাস করতে প্রতি ১৫ মিনিট পর বিরতি নিন।
৬. অত্যধিক অ্যালকোহল সেবন
নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যালকোহল আপনাকে উষ্ণ অনুভূতি দেবে, কিন্তু বিশেষ করে এ অবস্থায় ঠা-া আবহাওয়ায় বাইরে বের হলে আপনি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। এসব পানীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন এবং ঠা-া রাতে বাইরে বের হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করম্নন। লেয়ারে ড্রেসিং করে উষ্ণ ও শুষ্ক থাকুন, লাইটওয়েট ও ইনসুলেটিং বেইস লেয়ার দিয়ে শুরম্ন করম্নন। ত্বক কতটুকু অনাবৃত আছে তার ওপর নির্ভর করে শরীর কতটুকু তাপমাত্রা হারাবে, তাই হ্যাট, স্কার্ফ ও গস্নাভস পরিধান করতে ভুলবেন না যেন। সামিট পোস্ট ডট ওআরজির মতে, শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য পানিও চমৎকার। তাই হাইড্রেটেড থাকুন।





