জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে চারটি পথে এগোচ্ছে বিএনপি।
সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে বিএনপি চেয়ারপারসনকে দ্রুত জামিনে মুক্ত করার পাশাপাশি তার অন্য সব মামলার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, এ বিষয়ে রাজপথে ক্রমান্বয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন জোরদার, দেশে-বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং জোটের শরিকদের বাইরেও অন্য রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করতে চায় দলটি।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার কারাবন্দির ঘটনায় দেশে-বিদেশে বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে। এ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আগামীতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সহজ হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিমূলক কাজও চলবে বলেও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানিয়েছেন।
আইনি পদক্ষেপ : বিএনপি নেতারা জানান, সরকার বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে নীল নকশা করছে। এরই অংশ হিসেবে জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। বিচারাধীন রয়েছে আরও বেশ কিছু মামলা। খালেদা জিয়া ছাড়াও সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আইনি লড়াইকে প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি। বিশেষ করে দলের এখন প্রধান টার্গেট খালেদা জিয়ার মুক্তি।
এ বিষয়ে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। রায়ের সার্টিফাইড কপি পেলেই এ আপিল করা হবে। এছাড়া অন্য সব মামলা মোকাবিলা করার জন্য আইনগত যা যা প্রয়োজন সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেল সদস্য শহীদুল ইসলাম বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৫টির মতো মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সরকার পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ করেই রায়ের জন্য দিন ধার্য হবে। এছাড়া অন্য যেসব মামলা আছে তাতে কোর্টে হাজির হয়ে জামিন চাইতে হবে বিএনপি চেয়ারপারসনকে। এসব মামলায় যথাযথভাবে আইনি লড়াইয়ের জন্য বিএনপির আইনজীবী প্যানেল কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি : দলীয় সূত্র জানায়, নেতাদের মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সোচ্চার হচ্ছে বিএনপি। মামলা-মোকদ্দমা থেকে নেতাদের মুক্ত করা এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবিতে চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আরও জোরদার করবে দলটি। এসব আন্দোলন কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো দলের পক্ষে জনমত তৈরির টার্গেট সংশ্লিষ্টদের। এজন্য বিএনপির সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি বিএনপিপন্থী পেশাজীবীদেরও সক্রিয় করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার পেশাজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতারা। এতে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী সব কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্র মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে বিএনপি। বরং এসব কর্মসূচিকে ক্রমান্বয়ে বড় আকার দেওয়া হবে। কর্মসূচিতে ২০ দলীয় জোটের শরিকদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। আগামীতে জোটের পক্ষ থেকেও আলাদা কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উচ্চ আদালত থেকেও খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে নেতিবাচক রায় এলে কর্মসূচির ধরন বদলাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দুই দফা টানা কর্মসূচি শেষে দুই দিন বিরতি দিয়ে বিক্ষোভসহ তিন দিনের নতুন কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। গতকাল দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শনিবার দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর অভিযান, রোববার সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মরকলিপি পেশ ও মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর ছাড়া জেলা-মহানগরগুলোতে বিক্ষোভ-সমাবেশ।
মির্জা ফখরুল বলেন, মিথ্যা, ভুয়া ও জাল নথি দিয়ে সাজানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে এবং তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো।
তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলছি, আমরা শান্তি চাই, আমরা কোনো সংঘাত চাই না। আমরা দেশে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করতে চাই, যে অবস্থার মধ্যে আমরা আগামী নির্বাচনে জনগণ যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সে অবস্থা তৈরি করতে চাই। সে লক্ষ্যেই আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিচ্ছি।
২২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে জানিয়ে বিএনপি মহসচিব বলেন, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি সমাবেশের জন্য আমরা অনুমতি চাইব। আমরা আশা করব, সোহরাওয়ার্দীতে জনসভা করার অনুমতি সরকার দেবে। এর জন্য শিগগিরই তারিখ ঠিক করে জানানো হবে বলে মির্জা ফখরুল জানান।
কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি : খালেদা জিয়ার কারাবন্দি পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে-বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করা হচ্ছে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে খালেদা জিয়ার সাজা পরবর্তী ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত প্রায় ২৫টি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা।
সূত্র মতে, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে সরকারের নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরেন বিএনপি নেতারা। এ সময় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া সম্প্রতি লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে।
বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা হচ্ছে : বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন টার্গেট করে বিএনপির নেতৃত্বে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে টেলিফোনে দেওয়া বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ২০ দলের শরিকদের বাইরে থেকে আগ্রহী দলগুলোকে নিয়ে এ জোট করার কথা বলেছেন তিনি। এ জোট ‘জনতার জোট’ হিসেবে পরিণত হবে বলেও তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, বর্তমান সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করাই বিএনপি জোটের টার্গেট। ২০ দলের বাইরে যেসব গণতান্ত্রিক দল আছে, তাদের নিয়ে ইস্যুভিত্তিক বা যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি জোট গঠনেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।





